ভিডিও বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:০০ এএম

রাহমান ওয়াহিদ

শিশুদের হাতে স্মার্টফোন কতটা নিয়ন্ত্রণে

শিশুদের হাতে স্মার্টফোন কতটা নিয়ন্ত্রণে

এ যুগের পরম বিস্ময় স্মার্টফোন বড়দের হাত হয়ে এখন অনেক ছোট ছোট শিশু-কিশোরদের হাতেও বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে এসেছে। একটি গবেষণা তথ্য বলছে-বাংলাদেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ শিশু স্কুলে ভর্তির আগেই (প্রি স্কুল) স্মার্টফোনে অত্যন্ত হয়ে পড়ে। ৮৫ শতাংশ শিশু মা বাবার সময় কম দেওয়ার কারণে, খেলার মাঠের অভাবে ৫২ শতাংশ, খেলার সাথীর অভাবে ৪২ শতাংশ স্মার্টফোনে যুক্ত হচ্ছে। 

গবেষণায় নির্বাচিত ৪০০ শিশুর প্রত্যেকেই স্মার্টফোন ব্যবহার করে, যাদের ৯২ শতাংশ তাদের বাবা-মায়ের স্মার্টফোন। গবেষণাটিতে আরো বলা হয়েছে-বাংলাদেশের শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন ঘন্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করে থাকে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সুপারিশকৃত সর্বোচ্চ সময়ের থেকেও প্রায় তিন গুণ বেশি। এই উদ্বেগজনক চিত্রটি আমাদের না ভাবিয়ে পাবে না। তার মানে এই নয় যে-এখনি হুট করে শিশুদের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিতে হবে। কেড়ে নিলেই যে মোবাইল থেকে শিশুদের এব ব্যবহার থেকে নিবৃত্ত করা যাবে, তা প্রায় অসম্ভব। এজন্য আগে পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি জরুরি। 

আমবা এখন অনেকেই জানি যে স্মার্টফোনে আসক্ত শিশুদের ঘুমের সমস্যা হয়, মাথা ব্যথা হয়, পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় মানসিক বিকাশে। স্মার্টফোনে আসক্ত শিশুরা সারাক্ষণ একা থাকতে ভালোবাসে; যে কারণে বাইরে যাওয়া, অন্যদের সাথে মেলামেশা ও সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলাব ইচ্ছেটাও কমে যায়। এর ওপর পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার জন্য অভিভাবকদের চোখ রাঙানি, এক কোচিং থেকে আরেক কোচিংয়ে ছুটোছুটি এসব তো আছেই। এসব সমস্যার সাথেই মিশে গেছে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহাবের প্রবণতাটি। কিন্তু আমরা হয়তো অনেকেই জানি না, একটা বয়স পর্যন্ত শিশুদের হাতে মোবাইল দেওয়াই উচিত না। 

ঢাকা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু নিউবোলজি বিভাগের অধ্যাপক ভাঃ গোপেন কুমার কুন্ডু এ বিষয়ে বলেছেন, এক দুই বছরের বাচ্চারা যথন কথা বলতে শুরু করে, তখন তারা মোবাইল হাতে পেলে তাদের বলবার কথাগুলো হারিয়ে ফেলে, আবার অনেক বাচ্চা কথাই ভুলে যায়। হাঁটা, বসা, চলা, কথা বলা ও বুদ্ধির বিকাশ এগুলোর সবই তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এ সময়টাকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো না যায় তাহলে সেই প্রত্যাশিত মানসিক বিকাশটি আর কখনো হয়ে ওঠে না। এ সময়ের মধ্যে বাচ্চাদের হাতে মোবাইল গেলে বাচ্চারা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের প্রতি মারাত্মকভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। মানসিক বিকাশটি তখন হয়ে পড়ে অনেকটা বন্ধ। 

আমেরিকার পেডিয়াট্রিক সোসাইটির গাইডলাইনে বলা হয়েছে-প্রথম দুই বছর বাচ্চাদের মোবাইল দেওয়াই যাবে না। তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের এক ঘন্টা শুধু শিক্ষামূলক কাজের জন্য মোবাইল দেওয়া যায়। চীন দেশে শিশুদের স্মার্টফোনের আকর্ষণ দূর করতে 'মাইনর মোড' নামে একটি ব্যবস্থার অধীনে বয়স অনুযায়ী শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের দৈনিক সর্বোচ্চ ৪০ মিনিট, ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের দৈনিক সর্বোচ্চ ১ ঘন্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আর বাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার একেবারে নিষিদ্ধ। (জরুরি প্রয়োজন ছাড়া) তবে শুধু বিনোদনের জন্য তারা দিনে তিনঘন্টা অনলাইন গেম খেলার সুযোগটুকু পায়। পাশের দেশ ভারতেও ইন্ডিযান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিক এব নির্দেশনা অনুযায়ী দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের স্ক্রিনের সামনে বসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পাঁচ থেকে দশ বছর বয়সীদের জন্য দিনে দুই ঘন্টার কম স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। স্মার্টফোনকে শিশুদের নাগালের বাইরে রাখার জন্য এ ধরনের বিধিবিধান আমাদের দেশেও চালু করা যে অসম্ভব, তা নয়। এর জন্য প্রয়োজন শুধু সরকারিভাবে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ আর ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা। 

আরও পড়ুন

বিশেষজ্ঞবা বলছেন, আজকের অভিভাবকরা বাচ্চাদের হাতে যে কতটা শক্তিশালী ও ক্ষতিকর এ যন্ত্রটি তুলে দিচ্ছেন, তা তারা হয়তো এখন কল্পনাও করতে পারছেন না। যখন বুঝবেন, তখন তার বাচ্চার অপূরণীয় ক্ষতিটা হয়ে যাবে। তাই সবার আগে মা বাবার সচেতনতাই শিশুর মোবাইল ব্যবহাব অনেকটা কমাতে পারে। মা-বাবারা ইচ্ছে করলে শিশুরা ঘুমিয়ে পড়লে বা শিশুরা স্কুলে গেলে কিছুক্ষণের জন্য মোবাইল ব্যবহার করতে পাবেন। শিশুদের মোবাইল ব্যবহারেব পরিবর্তে গল্পের বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পারেন, সৃজনশীল কাজ যেমন ছবি আঁকা, গল্প করা, নাচগান করবা, অভিনয় করা ঘরোয়া খেলা এসবে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। বাইরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যেতে পারেন। কারণ তাদের তো বাইরের অবারিত প্রকৃতির মধ্যে কৈশোরের কোন আনন্দ পাওয়ারই সুযোগ রাখা হয়নি।

মোবাইল প্রযুক্তি অবশ্যই জ্ঞান দক্ষতা, ও যোগাযোগের দারুণ এক মাধ্যম। কিন্তু একজন অসহায় মানুষের পাশে কীভাবে দাঁড়াতে হয়, বন্ধুর কষ্ট কীভাবে বুঝতে হয় কিংবা নিজের ভুল কীভাবে সংশোধন করতে হয়, এসব শেখার জন্য কিন্তু কোন অ্যাপ নেই মোবাইলে। একটি শিশুর মানবিক মন অ্যাপ দিয়ে তৈরি করা যায় না। মা বাবার সান্নিধ্যে থেকে অনেক কিছু দেখতে দেখতেই শিশুর ভেতরে মানবিকতার বোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই বোধ তৈরির জন্য সন্তানকে আমরা কতটা সময় দিচ্ছি? আদৌ দিচ্ছি কি?

লেখকঃ কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট, ০১৭১১-০৫৫২৮১

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শিশুদের হাতে স্মার্টফোন কতটা নিয়ন্ত্রণে

ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে: মাহদী আমিন

সাগরে গভীর নিম্নচাপ, বৃহস্পতিবার যেমন থাকবে আবহাওয়া

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

ভুয়া ইউনানি ওষুধ তৈরির দায়ে এনসিপির নেতার ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা