মোঃ ফারুক আহম্মেদ
দুই দশকে কতটা এগিয়েছে সিএমএসএমই, চাকরি বেড়েছে কতটা?
বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম বড় ভিত্তি হলো ছড়িয়ে থাকা কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ বা সিএমএসএমই। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক শুমারি-ভিত্তিক তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯৯ শতাংশের বেশি এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। এই খাতে ৩ কোটির বেশি মানুষ কর্মরত। অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ এবং শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই সিএমএসএমইর সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ এটি শুধু ছোট ব্যবসার সমষ্টি নয়; বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
বড় শিল্পের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে একটি বড় শিল্পকে ঘিরে কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, প্যাকেজিং, পরিবহন, মেরামত ও নানা সেবায় অসংখ্য ছোট উদ্যোগ গড়ে ওঠে। ফলে বড় শিল্পের বিনিয়োগের সঙ্গে ছোট উদ্যোক্তা ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে। আবার বড় কোনো শিল্প বন্ধ বা উৎপাদন কমিয়ে দিলে শুধু সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই নন, আশপাশের অসংখ্য ছোট উদ্যোক্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই বড় শিল্পের স্থিতিশীলতা ও সিএমএসএমইর সক্ষমতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
এর সঙ্গে রয়েছে অর্থায়নের সমস্যা। একজন নতুন উদ্যোক্তার ভালো ব্যবসায়িক ধারণা, দক্ষতা ও বাজার থাকতে পারে; কিন্তু জমি-জামানত, দীর্ঘ ব্যবসায়িক ইতিহাস বা শক্তিশালী আর্থিক বিবরণী না থাকায় তিনি ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাই শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানো নয়, ব্যবসার সম্ভাবনা, নগদ প্রবাহ, বাজার, ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধ সক্ষমতাকেও ঋণ মূল্যায়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রশ্ন হলো, প্রায় দুই দশকের সিএমএসএমই উন্নয়ন উদ্যোগের পর আমরা কতটা সফল? ২০১৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ১৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যায় সম্প্রসারণ হয়েছে। এটি অবশ্যই অর্জন। কিন্তু শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেই সিএমএসএমই খাত শক্তিশালী হয়েছে বলা যায় না। দেখতে হবে, কতটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ টেকসই ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, কতটি ছোট প্রতিষ্ঠান মাঝারি হয়েছে, কতজন উদ্যোক্তা আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের আওতায় এসেছেন এবং কত নতুন স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও বিভিন্ন সময়ে বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের বাস্তব অর্জন কতটা, সেটিও মূল্যায়ন করা জরুরি। কতজন নারী উদ্যোক্তা এসব সুবিধা নিয়ে টেকসই ব্যবসা গড়ে তুলেছেন, নিয়মিত অর্থায়নের আওতায় এসেছেন এবং তাঁদের উদ্যোগ থেকে কত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে—তার পরিমাপযোগ্য হিসাব থাকা প্রয়োজন। শুধু সুবিধা দেওয়ার সংখ্যা নয়, তার ফলাফলই হওয়া উচিত সাফল্যের অন্যতম মানদণ্ড।
প্রযুক্তির ব্যবহারও সিএমএসএমইর অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখনও সীমিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাত্র ১২ শতাংশ ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ ব্যবসায়িক কাজে ডিজিটাল প্রযুক্তি বা আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে; ভিয়েতনামে এ হার ৪১ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ ডিজিটাল ব্যবহারে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী দেশে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করছে, যার মধ্যে ১৯ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা বা কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন করে। এই চিত্র দেখায়, কিছু উদ্যোগ দ্রুত প্রযুক্তির দিকে এগোলেও বড় অংশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে। তাই শুধু ঋণ নয়, প্রযুক্তি গ্রহণ, ডিজিটাল লেনদেন, দক্ষতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় সহায়তা দেওয়াও সিএমএসএমই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
এখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। সিএমএসএমই নীতিমালা অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয়ের রয়েছে নীতি বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব। বিসিক ও সিএমএসএমই ফাউন্ডেশনকে বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব অর্থায়নের সুযোগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো। সিএমএসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার ও বাজারসংযোগে সহায়তা করে।
আরও পড়ুনকিন্তু দায়িত্ব, নীতি ও কর্মসূচি থাকার পরও ফলাফল কতটা দৃশ্যমান—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। একজন উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণের জন্য এক জায়গায়, ঋণের জন্য আরেক জায়গায় এবং বাজারসংযোগের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানে ছুটতে হলে সমন্বিত সহায়তার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। প্রশিক্ষণের পর অর্থ, সরঞ্জাম ও পরামর্শের অভাবে অনেক উদ্যোগ আর এগোতে পারে না। তাই প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগকে আলাদা কর্মসূচি হিসেবে না দেখে উদ্যোক্তার পুরো যাত্রাকে একসঙ্গে দেখতে হবে।
সিএমএসএমইর বড় শক্তি হলো এর বিস্তৃতি। তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এই খাতকে শক্তিশালী করা মানে স্থানীয় অর্থনীতি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানও শক্তিশালী করা। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই ছোট উদ্যোগ শুরু করতে চাইছেন। তাঁদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে হবে। এজন্য সহজ অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যবসার ধারণা যাচাই, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, বাজারসংযোগ ও ব্যবসা পরিচালনার পরামর্শ প্রয়োজন।
বড় শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। কিন্তু তার পাশে শক্তিশালী সিএমএসএমই না থাকলে শিল্পায়নের সুফল সীমিত থাকবে। তাই সিএমএসএমইকে শুধু একটি ঋণখাত হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
চাকরি শুধু বড় প্রতিষ্ঠানে তৈরি হয় না। একজন শিক্ষিত তরুণের ছোট উদ্যোগও একদিন বহু মানুষের কর্মসংস্থানের ভিত্তি হতে পারে। তাই সিএমএসএমইকে এগিয়ে নেওয়া মানে শুধু ছোট উদ্যোক্তাকে সহায়তা করা নয়; এটি কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করার লড়াই।
লেখক : সাবেক ব্যাংকার
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক

_medium_1789362422.jpg)
_medium_1789195617.jpg)
_medium_1789016886.jpg)
_medium_1788930810.jpg)
_medium_1788775905.jpg)
_medium_1789539639.jpg)

_original_1789277703_medium_1789537857.jpg)