সিজুল ইসলাম
পানিতে ডুবে মৃত্যু: নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট
একটি শিশু সকালবেলা উঠানে খেলছিল। মা রান্নাঘরে, বাবা কাজে, দাদা-দাদী অন্য কাজে ব্যস্ত। কয়েক মিনিট পর শিশুটিকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। পরিবারের সবাই ছুটে বেড়াল। শেষ পর্যন্ত বাড়ির পাশের ছোট্ট একটি পুকুর থেকে ভেসে উঠল তার নিথর দেহ। এমন গল্প বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের কাছে অপরিচিত নয়। সংবাদপত্রে এমন খবর হয়তো একদিনের জন্য শিরোনাম হয়, কিন্তু একটি পরিবারের কাছে এটি আজীবনের বেদনা। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো এই মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। অনিচ্ছাকৃত আঘাতজনিত মৃত্যুর মধ্যে এটি বিশ্বের তৃতীয় প্রধান কারুণ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। বিশ্বে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ৯০ শতাংশেরও বেশি ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। থানায় অবগত না করায় প্রকৃত মৃত্যুর পরিসংখ্যানও অস্পষ্ট।
বাংলাদেশে গত এক দশকে শিশু মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ অর্জন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে এই বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো পানিতে ডুবে যাওয়া। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ১০ হাজারের বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩০ জনেরও বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং প্রায় ৪০ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু শুধু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে এর তথ্য অনুযায়ী, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের হদের মৃত্যুর ৪৩ শতাংশের জন্য দায়ী পানিতে ডুবে মৃত্যু। বিশ্বের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত এই শিশুমৃত্যু রোধ করা এখন সময়ের দাবি।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অসচেতনতা এবং বাড়ির কাছাকাছি উন্মুক্ত জলাশয়ের উপস্থিতি। প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটনা ঘটে বাড়ির মাত্র ২০ মিটারের মধ্যে মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকা পুকুর, ডোবা, খাল, নালা কিংবা বৃষ্টির পানিতে ভরা গর্তের মতো জলাশয়ে। প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তদারকির অভাব বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে, যখন পরিবারের সদস্যরা গৃহস্থালি, কৃষিকাজ বা অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখনই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে।এটি প্রমাণ করে যে, অধিকাংশ শিশুই নদী বা বড় জলাশয়ে নয়; নিজের বাড়ির আশপাশেই প্রাণ হারাচ্ছে। পাশাপাশি, সঠিক সময়ে পানি থেকে উদ্ধার করার এবং উদ্ধার-পরবর্তী জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞানের অভাবও এই মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনার খতিয়ান নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় অথচ অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সংকট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কয়েকটি কার্যকর, পরীক্ষিত ও স্বল্পব্যয়ী উদ্যোগের কথা বলেছে। এর মধ্যে রয়েছে,ঘরের দরজায় প্রতিবন্ধক তোর করা, জলাশয়ে শিশুদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে বেড়া বা নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন, প্রাক-প্রাথমিক ও আগের বয়সী শিশুদের জন্য নিরাপদ ডে-কেয়ার বা শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র চালু করা, স্কুলগামী শিশুদের সাঁতার, জলনিরাপত্তা ও নিরাপদ উদ্ধার কৌশল শেখানো, সাধারণ মানুষকে নিরাপদ উদ্ধার ও জীবনরক্ষাকারী প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং রেডিও, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সরকারি-বেসরকারি সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় উপাসানালয়ের বিভিন্ন সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ সর্বস্তরে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। আর কোনো শিশু পানিতে ডুবে গেলে তাকে উদ্ধারের পর প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত শিশুটিকে পানি থেকে তোলার পর অতি দ্রুত কোনো সনদপ্রাপ্ত বা প্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে এবং এরপর দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
এই সময়ে কিছু প্রচলিত ভুল বা কুসংস্কার সম্পূর্ণ বর্জন করা উচিত; যেমন শিশুকে মাথায় নিয়ে ঘোরানো, পেটে চাপ দিয়ে জোর করে পানি বের করার চেষ্টা করা, বমি করানো কিংবা ছাই বা লবণ দিয়ে শরীর ঢেকে দেওয়া। এই ক্ষতিকর কাজগুলো শিশুর জীবনকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
আরও পড়ুনআশার কথা হলো বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ বিষয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০২১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ডের যৌথ উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী পানিতে ডুবে মত্য প্রতিরোধ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং ২৫ জুলাইকে 'বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস' ঘোষণা করে। এটি বাংলাদেশের জন্য গর্বের অর্জন। কিন্তু আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব তখনই অর্থবহ হবে, যখন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুটিকে আমরা নিরাপদ রাখতে পারবো। বাংলাদেশ সরকার ইতোপূর্বে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র সম্প্রসারণ, শিশুদের সাঁতার শিক্ষা এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে কয়েকটি কর্মসূচিও বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে যথাযথ মনিটরিং ও বাস্তবায়নে সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এই উদ্যোগকে জাতীয় পরিসরে আরও বিস্তৃত করায় নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
একটি শিশু হারানো মানে শুধু একটি প্রাণ হারানো নয়; একটি পরিবারের স্বপ্ন হারানো, একটি সমাজের সম্ভাবনা হারানো এবং একটি দেশের ভবিষ্যতের একটি অংশ হারিয়ে ফেলা। আজই যদি আমরা সচেতন হই, তবে আগামীকাল হয়তো কোনো পরিবারের কান্না থামানো সম্ভব হবে। সম্ভব হলে পাঁচ বছর বয়সেই আপনার শিশুকে সাঁতার শেখান, তাহলে এ দুর্ঘটনার হার কমে আসবে। আর সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।সর্বোপরি, এই সামাজিক সমস্যা দূর করতে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
অভিভাবক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, স্থানীয় তরুণ সদস্য এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জাতীয়ভাবে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, পাঁচ বছর বয়স থেকেই সাঁতার প্রশিক্ষণে উৎসাহিত করা এবং ২৫ জুলাই 'বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস' উদযাপনের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। তবেই ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার তাতে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
লেখক: নাট্যকর্মী ও উন্নয়নকর্মী [email protected], ০১৭৩৮-১৬২১৫৬
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1789195617.jpg)
_medium_1789016886.jpg)
_medium_1788930810.jpg)
_medium_1788775905.jpg)
_medium_1788756258.jpg)
_medium_1788324143.jpg)
_medium_1789362422.jpg)
_medium_1789314667.jpg)
