টেকসই ড্রেনেজ মডেল: বগুড়ার জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকৌশল চাবিকাঠি
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বারখ্যাত বগুড়া আজ একবিংশ শতাব্দীর এক অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক ও নগরকেন্দ্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ কথা আজ অনস্বীকার্য যে, ভৌগোলিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত কারণে বগুড়া সমগ্র উত্তরবঙ্গের অলিখিত রাজধানী হয়ে ওঠার পথে ধাবমান। সম্প্রতি বগুড়া সিটি কর্পোরেশন ঘোষণার পর পরই এখানে ‘বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ এবং ‘বগুড়া ওয়াসা’র মতো নাগরিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জোরালো প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা চলছে। কিন্তু এই চোখধাঁধানো নগরায়ন ও জ্যামিতিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমান্তরালে এক গভীর ও জটিল নাগরিক সংকট আমাদের গ্রাস করছে। আকাশচুম্বী দালানকোঠা আর নাগরিক বিলাসের ভিড়ে আমাদের সড়কের পরিধি এবং পার্শ্ববর্তী নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ড্রেনেজ সিস্টেম এক চরম গোলকধাঁধায় রূপ নিয়েছে। এর অবধারিত ফল হিসেবে বাংলাদেশের অন্য বৃহৎ মহানগরের মতো বগুড়াতেও ‘জলাবদ্ধতা’ এক তীব্র, পুনরাবৃত্ত ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষার সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের ব্যস্ততম রাজপথগুলো যখন থৈ থৈ জলে নিমজ্জিত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তখন আধুনিক নগরায়নের সমস্ত অহংকার নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে বগুড়ার বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক খাল ও নিচু জলাভূমিগুলো আজ দখল আর ভরাটের নির্মম শিকার। যে বিস্তীর্ণ জলাশয় ও অপরিহার্য জলাভূমিগুলো একসময় অতিরিক্ত বৃষ্টির জল শুষে নিত, আজ সেখানে দাঁড়িয়েছে কংক্রিটের জঙ্গল। ফলে শহরের ভূপৃষ্ঠের জলপ্রবাহ বা বৃষ্টির পানি ধারণের স্বাভাবিক ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আজ একটু ভারি বর্ষণ হলেই জিরো পয়েন্ট সাতমাথা এলাকা, অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত জলেশ্বরীতলা, বড়গোলা, কাজী নজরুল ইসলাম রোড, শেরপুর রোড, পার্ক রোড, রহমান নগর, স্টেশন রোড, খান্দার রোড, ফতেহ আলী বাজার, কাটনারপাড়া কিংবা লতিফপুর কলোনির মতো প্রধান এলাকাগুলিতে নিয়মিত হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত জল জমে থাকে। নর্দমার বন্ধ মুখ থেকে উপচে পড়া নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি যখন রাস্তা পেরিয়ে মানুষের শোবার ঘর কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে, তখন জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে এবং আবাসিক এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে দৈনন্দিন যাতায়াতকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক গবেষণায় বগুড়ার এই দীর্ঘস্থায়ী জলজটের নেপথ্যে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারিগরি ও অবকাঠামোগত ত্রুটি উঠে এসেছে। প্রথমত, শহরের অধিকাংশ কৃত্রিম নর্দমা বা ড্রেন উপযুক্ত ঢাল বজায় না রেখে নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে পানির স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং এগুলো নিষ্কাশন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। দ্বিতীয়ত, বনানী থেকে মাটিডালি মহাসড়ক বরাবর বিভিন্ন অবকাঠামো স্থাপনের সময় অত্যন্ত সংকীর্ণ নিকাশী পাইপলাইন ব্যবহার করায় তা পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এর ওপর কঠিন বর্জ্য ও পলি জমার কারণে পানির স্বাভাবিক নিষ্কাশন পথ রুদ্ধ হয়ে নোংরা পানি রাস্তায় উপচে পড়ছে। বাংলাদেশের শহরগুলোতে জায়গার সংকুলানের অভাবে সাধারণত যৌথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা (ঈড়সনরহবফ ঝুংঃবস) ব্যবহার করা হয়, যেখানে গৃহস্থালির গার্হস্থ্যবর্জ্যসহ জল এবং বৃষ্টির জল একই পাইপ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই ব্যবস্থায় অপচনশীল কঠিন বর্জ্য যখন ড্রেনকে ব্লক করে দেয়, তখন ভারি বর্ষণের সময় বৃষ্টির পানি (ঝঃড়ৎস ডধঃবৎ) বের হওয়ার কোনো পথ পায় না এবং কৃত্রিম নর্দমাগুলো সেই পরিমাণ জল সামলাতে পারে না।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কিছু ক্ষুদ্র ভিডিওতে দেখা গেছে, বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মহোদয় প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের সাথে নিয়ে সরজমিনে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করছেন এবং এই সংকটের জন্য মূলত তাদের অতীত কৃতকর্ম বা অপরিকল্পিত অবকাঠামোকে দায়ী করছেন। দোষারোপের এই চিরাচরিত সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠে এখন প্রয়োজন একটি বিজ্ঞানসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা। বাংলাদেশের নগরগুলোতে জলাবদ্ধতা নিরসনে সাধারণত কোটি কোটি টাকার ভারী অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কারে জোর দেওয়া হয়, অথচ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে অত্যন্ত স্বল্প খরচে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব। উন্নত বিশ্বে যেকোনো নগর পরিকল্পনার প্রাথমিক ভিত্তি হলো প্রতিটি অঞ্চলের একটি নিখুঁত সমোচ্চ রেখাচিত্র (ঈড়হঃড়ঁৎ গধঢ়) । এই ম্যাপ থেকে শহরের প্রতিটি বিন্দুর রিডিউসড লেভেল (জখ)অর্থাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তাদের প্রকৃত উচ্চতা জানা যায়। যেহেতু পানি তরল এবং এর প্রবাহ ধর্ম সর্বদাই উঁচু লেভেল থেকে নিচের দিকে, তাই নিখুঁত জখ মান জানা থাকলে কোন দিক দিয়ে কৃত্রিম ড্রেন বা খাল খনন করে শহরের পানি নিখুঁতভাবে নিষ্কাশন করা যাবে, তার একটি পূর্ব পরিকল্পনা অনায়াসেই দাঁড় করানো যায়।
বগুড়াকে একটি আধুনিক, বাসযোগ্য ও জলাবদ্ধতামুক্ত মেগাসিটিতে রূপান্তর করতে হলে কেবল নতুন ড্রেন নির্মাণ করলেই চলবে না, বরং সমন্বিত পানি মহাপরিকল্পনার আওতায় অবরুদ্ধ প্রাকৃতিক জলপথ ও খালগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। এর পাশাপাশি প্রয়োজন বিকেন্দ্রীভূত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা । তবে এই সমস্ত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও টেকসই সমাধানের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত দক্ষ লোকের সমাগম। একটি নবগঠিত সিটি কর্পোরেশনের প্রাথমিক ও মৌলিক প্রকৌশলগত ক্রিয়াকর্ম সফল করতে এবং নতুন নতুন এলাকাভিত্তিক ড্রেনেজ সিস্টেম তৈরি করতে দক্ষ পুরকৌশলী, দূরদর্শী নগর পরিকল্পনাবিদ এবং গবেষণা—ভিত্তিক গবেষক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যোগ্য গবেষক প্যানেলের স্থায়ী উপস্থিতি আবশ্যক। কারিগরি দূরদর্শিতাহীন সিদ্ধান্ত কখনো একটি টেকসই শহর উপহার দিতে পারে না। বগুড়া যখন উত্তরবঙ্গের অগ্রযাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছে, তখন এর নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে সাজানোই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।
আরও পড়ুনলেখক:
প্রকৌশলী লিটন চন্দ্র দাস
সদস্য, ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (ওঊই)
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,
পুন্ড্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








