তরুণদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে কেন
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কার আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি বদলে দিয়েছে আমাদের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা ও অবসর কাটানোর ধরন। আজ পৃথিবীর প্রায় সব তথ্যই আমাদের হাতের মুঠোয়। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব কিংবা ইন্টারনেট ছাড়া দৈনন্দিন জীবন কল্পনা করাও কঠিন। যদি আমরা মাত্র পাঁচ-সাত বছর আগের সময়ের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব মানুষের অবসর কাটানোর অন্যতম মাধ্যম ছিল বই। গল্প, উপন্যাস, কবিতা কিংবা প্রবন্ধের বই হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন অনেকে। বই শুধু জ্ঞানার্জনের মাধ্যমই ছিল না, বরং ছিল আনন্দ, কল্পনা ও মানবিক বিকাশের অন্যতম উৎস। বইকে মানুষের পরম বন্ধু বলা হয়। জীবনের পথে মানুষ অনেকের কাছ থেকেই প্রতারিত হতে পারে, কিন্তু একটি ভালো বই কখনো কাউকে প্রতারিত করে না। বরং বই মানুষকে নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখায়, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে এবং স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। বিশ্বের বহু মনীষীর চিন্তা, দর্শন ও অভিজ্ঞতা বইয়ের মাধ্যমেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে গেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বই পড়ার সেই চর্চা অনেকটাই কমে এসেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানুষ এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে বই পড়ার জন্য সময় বের করা অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে গেছে।
অবশ্য প্রযুক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। কারণ এসব মাধ্যমের যেমন কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি রয়েছে অসংখ্য ইতিবাচক সম্ভাবনাও। সমস্যা মূলত ব্যবহারের ধরনে। আমরা চাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বই, সাহিত্য, গবেষণা কিংবা জ্ঞানভিত্তিক বিষয় সম্পর্কে জানতে পারি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা এমন বিষয়গুলোর প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হই, যা তাৎক্ষণিক বিনোদন দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমাদের চিন্তাশক্তি বা জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করে না।
বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এত বেশি সময় ব্যয় করছে যে একাডেমিক পড়াশোনাতেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের প্রতিই যখন মনোযোগ কমে যাচ্ছে, তখন সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস বা গবেষণাধর্মী বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বিষয়টি সত্যিই চিন্তার কারণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রযুক্তি আমাদের শত্রু। বরং প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলেই এটি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে অসংখ্য ই-বুক, অনলাইন লাইব্রেরি ও সাহিত্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যেখানে সহজেই বই পড়া যায়। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ।
আমাদের বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু সেই বিনোদনের একটি বড় উৎস হতে পারে বইও। একটি ভালো বই যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি চিন্তার জগতকে প্রসারিত করে এবং ব্যক্তিত্বকে সমৃদ্ধ করে। তাই আমাদের উচিত অবসর সময়ের কিছু অংশ হলেও বই পড়ার জন্য বরাদ্দ রাখা। সময়কে অযথা অপচয় না করে যদি আমরা জ্ঞানচর্চা ও আত্মউন্নয়নের কাজে ব্যয় করি, তাহলে ব্যক্তি জীবন যেমন সুন্দর হবে, তেমনি উপকৃত হবে সমাজ ও দেশও। রুশ সাহিত্যিক লিও টলস্টয় বলেছিলেন, “জীবনে তিনটি জিনিস প্রয়োজন -বই, বই এবং বই।” বই আমাদের এমন এক আত্মীয়, যার সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই, কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই। তাই আসুন, আমরা আবার বইয়ের কাছে ফিরে যাই, ফিরে যাই জ্ঞানের সেই অফুরন্ত ভান্ডারে।
আরও পড়ুনলেখক :
তাজকিয়া সুলতানা
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








