ভিডিও বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৪ মে, ২০২৬, ০৪:২০ দুপুর

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা

অপরূপ সৌন্দর্যের আধার বাংলাদেশ যার প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যের কোনো জুড়ি নেই। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকা বিভিন্ন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে বিশেষায়িত। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হচ্ছে বাংলাদেশের কক্সবাজার। বিশ্বের দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর একক বৃহত্তম জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন, একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকনের স্থান সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা, দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ রঙের নয়নাভিরাম চারণভূমি সিলেট, আদিবাসীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি ও কৃষ্টি-আচার সমৃদ্ধ উচ্চ সবুজ বনভূমি ঘেরা চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল, অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনগুলো। ফলে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থান ঘটবে ও বেকারত্ব দূরীকরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে। বিশ্বের যে-দেশ পর্যটন শিল্পে যত উন্নতি করতে পেরেছে সে-দেশ অর্থনৈতিকভাবে তত লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক অবস্থানগত ও কৌশলগত কারণে পর্যটন শিল্পকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিনোদনমূলক শিল্পে পরিণত করা কঠিন কিছু নয়। সপ্তম শতকে প্রখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং বাংলাদেশে ভ্রমণে এসে এর সৌন্দর্যকে কুয়াশা ও পানি থেকে উন্মোচিত ঘুমন্ত সৌন্দর্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। সভ্যতার একটি কেন্দ্র হিসেবে পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে এই দেশে বাংলাদেশের বেশির ভাগ পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় সিন্ডিকেট ও লোকাল গাইডদের দ্বারা প্রতারিত হন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সঠিকভাবে দেখতে পারেন না ফলে পর্যটকেরা হতাশ হন এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলোর ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এ সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে পৃথিবীর অন্যতম পর্যটন গন্তব্য পরিণত করতে আমাদের আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। এ শিল্পের বিকাশে প্রথমেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়া অতীব জরুরি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে বহুমুখী পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থানগুলো দূষণের শিকার। দেশে প্রয়োজনীয় পর্যটন বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, কুয়াকাটা, সুন্দরবনের সমুদ্রসৈকত সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থা না থাকায় জাহাজে ভ্রমণকালে পর্যটকরা তাদের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি সমুদ্রে ফেলে পরিবেশ দূষণ করছে। এছাড়া বাংলাদেশে পর্যটনের অন্যতম অঞ্চল হচ্ছে সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। সুন্দরবনের মোট আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এছাড়া অতিথি পাখির স্বর্গরাজ্য সোনাদিয়াদ্বীপ মহেশখালীর দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত সোনাদিয়া একটি ছোট্ট বালির দ্বীপ। দূর থেকে দেখতে প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনের মতো। কিন্তু সোনাদিয়ার সৌন্দর্য আলাদা। পাহাড়, সবুজ ঘন প্যারাবন পেছনে ফেলে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে যেতে হয় এই সোনাদিয়ায়। কক্সবাজার শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে এই দ্বীপের অবস্থান। ঐতিহাসিকরা এটিকে সোনালী দ্বীপ বলেছেন।  প্রতিবছর শীতের মওসুমে এখানে হাজার হাজার অতিথি পাখির ভিড় জমে, তাই এটিকে অতিথি পাখির স্বর্গরাজ্যও বলে। সাগর থেকে ধরে আনা তরতাজা মাছ বালুচরে কেটেকুটে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করার কান্ডকারখানা স্বচক্ষে দেখা যায়। স্বপ্নের প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র সামুদ্রিক প্রবালদ্বীপ হচ্ছে কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন। এটি বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত। প্রকৃতির এ বিস্ময়কর প্রবালদ্বীপটি টেকনাফ থেকে প্রায় ৮ মাইল দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত। জিঞ্জিরা, দক্ষিণ পাড়া, গলাছিরা ও চেরাদিয়া এই চারটি দ্বীপ নিয়ে ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপ’। সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরের পাড়ে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আকর্ষণে কক্সবাজারে তিনটি পর্যটন পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছে বর্তমান সরকার যা প্রশংসনীয়। প্রতি বছর এতে বাড়তি ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ তিনটি ট্যুরিজম পার্ক হল সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বহাল রাখতে পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দেয়া একান্ত প্রয়োজন মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। উল্লেখ্য যে, কোভিড মহামারির সময়ে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেলেও তবে ধীরে ধীরে এই সংখ্যা আবারও বাড়ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করছে। এই সংখ্যাটি সন্তোষজনক হলেও এর মাত্র ২ শতাংশ বিদেশি। বর্তমানে কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে নেয়া হচ্ছে নানা পরিকল্পনা। এসব ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ পর্যটন খাত থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হবে এবং দেশের অর্থনীতি হবে মজবুত ও টেকসই। এর মধ্যে প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক মসজিদ এবং মিনার বর্তমানে পর্যটন খাত পৃথিবীর জিডিপিতে প্রায় ১১ শতাংশ অবদান রাখে। ধারণা করেছিল যে পরবর্তী প্রত্যেক বছর আরো ৪ থেকে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ মিলিয়ন যা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪৩৫ মিলিয়নে। ধারণা করা হচ্ছে, বিগত ৭০ বছরে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৫০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পরিধি ব্যাপকতা লাভ করেছে। পর্যটনের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়ে বর্তমানে পৃথিবীর চারটি কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি কর্মসংস্থান তৈরি হয় পর্যটন খাতে। বাংলাদেশের পর্যটন খাতে আয় প্রায় ৭৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার। ভারত আয় করেছে ১০ হাজার ৭২৯ মিলিয়ন ডলার, মালদ্বীপ ৮০২ মিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কায় ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার এবং নেপালে ১৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা সার্কঋণক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় অপ্রতুল। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫১টি দেশের পর্যটকেরা বাংলাদেশে ভ্রমণ করবেন, যা মোট জিডিপির ১০ শতাংশ অবদান রাখবে। ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যটন শিল্পের অবদান। পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রোল মডেলে পরিণত হবে। ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের অবদান ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে পর্যটন শিল্প বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখে, যা বিশ্ব জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে ১৫৬ কোটি পর্যটক, অর্থাৎ প্রতি সাতজনের একজন পর্যটক। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ভ্রমণ পিপাসা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশে পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত আছেন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। এ ছাড়া পরোক্ষ ভাবে ২৩ লাখ। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১১০ কোটি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আর বিপুল সংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভ্রমণ করবে এশিয়ার দেশগুলোতে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পর্যটন খাতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, পদক্ষেপ গুলো হলো- ১. পর্যটন সমৃদ্ধ অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন ২. পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ৩. বিমানবন্দর ও নৌবন্দর স্থাপন ও উন্নয়ন ৪. পর্যটন স্পটে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা ৫. বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বিশ্বস্ত গাইডের ব্যবস্থা করা ৬. বিদেশে বাংলাদেশের ট্যুরিজম ৭. পাঠ্যপুস্তকে পর্যটন বিষয়ে কোর্সগুলো অন্তর্ভূক্তকরণ ৮. প্রচার প্রচারণার ব্যবস্থা করা ৯. পর্যটন বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ ১০. পর্যটন এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোন ব্যবস্থা। 

 

লেখক :

আরও পড়ুন

নজিবর রহমান জিয়া

গবেষক ও কলামিষ্ট। 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা

দেশে কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই: প্রাণিসম্পদমন্ত্রী

হামজাদের কোচ হিসেবে আলোচনায় জার্মান থমাস ডুলি

মোংলায় ট্রলার থেকে নদীতে পড়ে যুবক নিখোঁজ

ইউক্রেনে রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ৬

দর্শকদের জন্য মার্কিন ভিসা সহজ করছে যুক্তরাষ্ট্র