ভিডিও বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৩ মে, ২০২৬, ০৩:৫৪ দুপুর

গণপরিবহন ও নাগরিক দুর্ভোগে নাজেহাল শহরের রাস্তা

বাংলাদেশের বড় শহরে বাস করা মানেই প্রতিদিন সকালে একটি বড় মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া। মনে হয় আজকেও কি বাস পাওয়া যাবে না? আবার কি ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করতে হবে? আবার কি দেরি হবে? শহরের মানুষদের এই ভাবনা এতটাই দৈনন্দিন যে এর সঙ্গে আমরা অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি, যদিও সমস্যাগুলো কখনোই সহনীয় হয়ে ওঠে না। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো যেন এক ধরনের যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই দ্বিতীয় যাত্রা। অনেকেই কয়েক মিনিট দাঁড়ানোর পর বুঝতে পারেন আজ বাস এত ভরা যে ওঠা মুশকিল। কয়েকটা বাস পেরিয়ে যায়, কেউ দাঁড়ায় না, কেউ দাঁড়ালেও চোখের সামনে ভিড়ে ঠাসা যাত্রী দেখলেই ওঠার ইচ্ছা হারিয়ে যায়। কেউ কেউ আবার ভিড় উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে উঠে যান; কারণ তাদের কাছে সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো কর্মস্থলে গেলে বস মুখ ভার করে তাকাবে, হয়তো ক্লাসে গেলে শিক্ষক উপস্থিতির জন্য নাম কেটে দেবে। 

ট্রাফিক জ্যামের কথা তো বলাই বাহুল্য। এই শহরে ট্রাফিক জ্যাম যেন দিনের অপরিহার্য অংশ। পাঁচ মিনিটের পথ কখনো কখনো চল্লিশ মিনিট লেগে যায়। গরমের দিনে জ্যামে আটকে থাকা আরও কষ্টদায়ক বাসের ভেতর গরম, ভিড়, হতাশা সব মিলিয়ে যাত্রা হয়ে ওঠে ক্লান্তির আরেক নাম। যাত্রীরা তখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবেন এই জীবন কি সত্যিই জীবনের মতো? এত কষ্ট কি প্রতিদিন সহ্য করতেই হবে? অনেক সময় বাসের চালকেরাও নিয়ম মানেন না। কখনো দ্রুত চালান, কখনো হঠাৎ ব্রেক করেন, কখনো যাত্রীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন। তাদের উপরও চাপ আছে একমাত্র ট্রিপ শেষ করে পরের ট্রিপ ধরতে হবে। কিন্তু এই তাড়াহুড়ো অনেক সময় মানুষের জীবনকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। 

নারী যাত্রীদের দুর্ভোগ আলাদাভাবে বলতেই হয়। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো, অস্বস্তিকর স্পর্শ, বাজে মন্তব্য এসব মেনে নেওয়া সত্যিই কষ্টকর। নারীদের জন্য আলাদা সিট থাকলেও অনেক সময় দেখা যায়, সেটা দখল করে বসে থাকে পুরুষ যাত্রীরা। নারীরা তখন অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। অনেকেই বাসে উঠতে চাইলেও এই অভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করে পা পিছিয়ে নেন। প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ যাত্রীদের অবস্থা আরও কঠিন। অনেক বাস এত উঁচু যে তাতে উঠতে তাদের সমস্যা হয়। আবার ভিড়ের কারণে দাঁড়িয়ে থাকাটাও কঠিন। তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেটা খুব কমই দেখা যায়। ছাত্র-ছাত্রীদের কষ্টও কম নয়। যারা সকাল সকাল ক্লাসে যায়, তারা প্রায়ই বাসের ভিড়ে পড়ে যায়। অনেক সময় বাস চালক ছাত্র দেখে দাঁড়াতেই চায় না। ফলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লাসের প্রথম ঘন্টা বা গুরুত্বপূর্ণ লেকচার মিস করে ফেলে। এতে তাদের মনেও বিরক্তি জমে ওঠে। 

শুধু যাত্রী নয়, শহরের পরিবেশও এসব সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অসংখ্য গাড়ি জ্যামে আটকে থাকায় জ্বালানি পুড়ে যায়, বাতাস দূষিত হয়, শব্দদূষণ বাড়ে। মানুষ ক্লান্ত হয়, রাস্তায় সময় নষ্ট হয়, কাজের গতি কমে যায় সমগ্র শহর যেন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু সমাধান অসম্ভব নয়। যদি আধুনিক ও পরিকল্পিতভাবে গণপরিবহনকে সাজানো যায়, তাহলে পরিস্থিতি অনেক বদলাতে পারে। যেমন -রুট অনুযায়ী নতুন বাস যোগ করা। বাসগুলো সময়মতো ছাড়ার ব্যবস্থা করা। ভালো মানের, নিরাপদ বাস চালানো। ট্রাফিক সিগন্যাল ঠিকভাবে কাজ করা। নারী ও বিশেষ যাত্রীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা কঠোরভাবে মানানো। ডিজিটাল টিকেট, মোবাইল অ্যাপ দিয়ে বাস ট্র্যাক করা। বাসস্ট্যান্ডগুলো উন্নত করা চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া ব্যবস্থা ভালো হলে শুধু যাত্রা নয় মানুষের মনের ওপরেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সকালে ঝামেলা ছাড়া যাত্রা করলে পুরো দিনের মেজাজও ভালো থাকে। পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় পাওয়া যায়, কাজ বা পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ে, স্ট্রেস কমে।

 গণপরিবহন শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার মাধ্যম নয় এটা একটি শহরের হৃদস্পন্দন। শহর বাঁচতে চাইলে, মানুষের জীবন সহজ করতে চাইলে, শহরের গতিকে ফিরিয়ে আনতে চাইলে গণপরিবহনের উন্নয়ন অপরিহার্য। ভালো গণপরিবহন মানে শুধু আরামপূর্ণ যাত্রা নয়, বরং একটা স্বস্তিকর জীবন। যেখানে মানুষ প্রতিদিন রাস্তায় বের হয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয় না।

আরও পড়ুন

লেখক :

আরশী আক্তার সানী 

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গণপরিবহন ও নাগরিক দুর্ভোগে নাজেহাল শহরের রাস্তা

বিশ্বকাপের বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড গড়ার পথে সোরিয়া

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে চীনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই : ট্রাম্প

বার্সা’র সঙ্গে ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি বাড়ালেন ফ্লিক

এপ্রিলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫১০ জন : যাত্রী কল্যাণ সমিতি

একনেক’র সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেল পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প