ভিডিও বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৪ মে, ২০২৬, ০৩:৫৫ দুপুর

সব চাপ কেন ঢাকাতেই

একটা শহরকে যদি সব বোঝা, সব দায়িত্ব আর সব মানুষের স্বপ্নের ওজন একসাথে বহন করতে দেওয়া হয়, তাহলে একসময় শহরটা হাঁপিয়ে ওঠে, ঠিক যেমন ভরা নদী তার তীর ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকাও এখন তেমনই হয়ে উঠেছে, চারদিক থেকে খড়কুটোর মতো মানুষ, কর্মস্থান, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন সব কিছু ঢাকায় এসে জমে আছে। অথচ দেশের মানচিত্র খুললে দেখা যায়, ঢাকার চারপাশে সমান সম্ভাবনাময় আরও সাতটি বিভাগীয় শহর নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, যেন তারা অপেক্ষায় আছে কোনো এক দিনের, যেদিন তাদেরও দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাদেরও মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু সেই দিনটি এখনো আসেনি। 

বাংলাদেশের রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন যে নতুন কিছু নয় তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে সব চাপ একটি শহরে ঢেলে দেওয়ার পরিণতি কী হতে পারে? দৈনন্দিন বাস্তবতা বলছে ঢাকায় এখন বাস, রাস্তা, অফিস, হাট বাজার, হাসপাতাল সবকিছুই সীমার অনেক বাইরে গিয়ে কাজ করছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় সংকট হলো মানসিক যা ঢাকায় বসবাসরত মানুষের ক্লান্তি, হাহাকার, অনিশ্চয়তা। তাদের মধ্যে অনেকেই বলেন,জীবনটাকে শুধু দৌড়াতেই কাটিয়ে দিই, বাঁচার সময় কোথায়? অথচ সিলেট, রাজশাহী, রংপুরের মতো শহরগুলো দিন শেষে শান্ত, প্রশস্ত, অপেক্ষাকৃত কম ভিড়পূর্ণ, যেখানে হাজার হাজার মানুষ সহজেই কাজ করতে পারতো, যদি সুযোগ থাকতো। 

সম্প্রতি কয়েকজন চাকরিজীবীর সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা যদি বিভাগীয় শহরে সমমানের অফিস, পদোন্নতির সুযোগ আর স্থায়ী পদের নিশ্চয়তা পেতেন তাহলে তাদের একটা বড় অংশ ঢাকায় নয় বরং নিজ শহরেই থাকতে চাইতেন। এই ঢাকাকেন্দ্রিকতার প্রধান কারণ দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অভ্যাস। নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন সবকিছু ঢাকায় থাকলেই নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। আবার, অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করে, ঢাকায় অফিস মানেই গুরুত্ব আর মর্যাদা। এর সাথে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাব যোগ হয়েছে, যেখানে বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা অনেক কিন্তু বাস্তবায়ন খুব কম। সেই সাথে উন্নয়নের ধারা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে বাজেট, প্রকল্প, লোকবল সবকিছুই প্রথমে ঢাকায় আসে, তারপর বাকিদের দিকে সামান্য খেয়াল করা হয়। যার ফলে বিভাগীয় শহর পুরো সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সাপোর্টিং রোল এ পড়ে থাকে। 

যদি এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হয় তাহলে শুধু কথার সংস্কার নয় কাজেরও সংস্কার প্রয়োজন। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও কর্মসংস্থানকেন্দ্র হিসেবে তৈরি করতে হবে। অনেক দপ্তর ও সরকারি অফিস যেগুলো ঢাকায় না থাকলেও চলে সেগুলো স্থানান্তর করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশ, সংস্কৃতি বা স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত অনেক শাখা বিভাগীয় শহরে স্থানান্তর করলে কাজে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না বরং কাজ আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে চলবে। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে আধুনিক প্রযুক্তি পার্ক, নথি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, প্রশাসনিক কমপ্লেক্স আর স্টাফ ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট তৈরি করলে কর্মীরাও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজে যুক্ত হতে পারবে। তাছাড়া, ডিজিটাল সেবা যদি প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয় তাহলে ছোট ছোট কাজের জন্য মানুষ আর ঢাকায় ছুটবে না।  

ঢাকার ওপর সব চাপ অযৌক্তিক আর অনিরাপদ। একটি দেশের উন্নয়ন কখনোই এক শহরকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয় যখন সেটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এখনই সাহসী পদক্ষেপ দরকার, ঢাকার কিছু দায়িত্ব ভাগ করে বিভাগীয় শহরগুলোর হাতে তুলে দিতে হবে। এতে শুধু ঢাকাই হালকা হবে না, বরং পুরো দেশই আরও স্বস্তিতে, আরও ভারসাম্যপূর্ণভাবে এগোতে পারবে। 

আরও পড়ুন

লেখক :

আরমীন আমীন ঐশী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দর্শকদের জন্য মার্কিন ভিসা সহজ করছে যুক্তরাষ্ট্র

সব চাপ কেন ঢাকাতেই

টঙ্গীতে জুতার কারখানায় আগুন

শ্রীপুরে অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যা

ইতালিয়ান কাপ জিতে ২০১০ সালের স্মৃতি ফেরাল ইন্টার

জামায়াত আমিরের সঙ্গে ইইউ’র রাষ্ট্রদূতের বৈঠক