ভিডিও বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:৩৫ দুপুর

বৈশাখ এলো উদ্দাম উল্লাসে

হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে।/বেড়া-ভাঙার মাতন নামে উদ্দাম উল্লাসে॥/বাতাসে তোর সুর ছিল না, ছিল তাপে ভরা। /পিপাসাতে বুক-ফাটা তোর শুষ্ক কঠিন ধরা। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখে জন্মেছিলেন বলেই বৈশাখের প্রতি তার এতো অনুরাগ! তার রচিত গানের বাণী উচ্চারণের মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন বছরের শুভ যাত্রা। এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ। /তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥ /যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,. অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥ /মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,. অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা। এমন অনেক কিছুরই আশ্রয়স্থল আমাদের রবীন্দ্রনাথ! শতবর্ষ ধরে বৈশাখ নিয়ে তার এই বাণী চির অমর, চির নতুন, চির সবুজ। আজবধি এই বাণী ছাপিয়ে যেতে পারেনি কোনো প্রজন্ম। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এই মাসের সূচনা করা হয়। এছাড়া, বৈশাখী পূর্ণিমা বুদ্ধ পূর্ণিমা হিসেবেও এ মাস পরিচিত, যা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বৈশাখ হলো পুরনোকে পেছনে ফেলে নতুন আশা ও উদ্দীপনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মাস।

ভ্যাপসা গরম ঝড়ের আশঙ্কা মাঠঘাট ফেটে চৌচির। সর্বত্র পানিহীনতায় হাহাকার আর গাছে গাছে মৌসুমি ফলের সমারোহ। কৃষকের নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ, কৃষানী ঘর গোছাতে ব্যস্ত। নতুন ধান আসবে।  পিঠা পায়েস হবে-আসবে অতিথি। অন্যদিকে ব্যবসায়িরা হালখাতার মাধ্যমে নতুনভাবে তাদের ব্যবসা এগিয়ে নিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। চারুকলায় জাতীয় ভাবে নববর্ষ বরণের জাঁকজমকপূর্ণ প্রস্তুতি চলতে থাকে মাসব্যপী। বিশেষ থিম নিয়ে এগোতে থাকে বিশাল কর্মযজ্ঞ। বিভিন্ন মটিভ শোভা পায় বৈশাখের আনন্দ রেলি বা মঙ্গল শোভাযাত্রার অনুষ্ঠানে। এটাতো জাতীয় ভাবে আয়োজনের অংশ। দেশব্যাপী আরও কত যে আয়োজন হয় বৈশাখ ঘিরে তার ইয়ত্তা নেই। চারিদিকে উৎসব উৎসব আমেজ। এইতো আমাদের বৈশাখ। এটি প্রথাগতভাবে আমাদের বাংলার গ্রামীণ ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। 

বৈশাখ প্রচন্ড গরমের মাস। এ সময়ে মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায় এবং পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। আবার বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই কখনো কখনো ধেয়ে আসে কালবৈশাখী ঝড়, যা উত্তপ্ত পরিবেশকে কিছুটা শীতল করলেও অনেক সময় তার ধ্বংস যজ্ঞের স্বীকার হয় ফসলের মাঠ ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট! জনজীবনে নেমে আসে দূর্ভোগ। বৈশাখের প্রথম দিনটি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উৎসব। একে বলা হয় ‘পহেলা বৈশাখ’ বা ‘বাংলা নববর্ষ’। এই দিনে মানুষ নতুন পোশাক পরে বিশেষ করে পাঞ্জাবি। পান্তা-ইলিশ খায় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা। ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা এর অন্যতম আকর্ষণ। গ্রামীণ ও ব্যবসায়ী জীবনে বৈশাখের প্রধান আকর্ষণ হলো ‘হালখাতা’ বা নতুন হিসাবের খাতা খোলা। ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন এবং গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করান। বৈশাখ ফসল কাটার মাস। মাঠ থেকে বোরো ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা থাকে কৃষকের। এছাড়া, এই মাসেই আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা রকমের রসালো ফল পাকতে শুরু করে। প্রায় উপজেলায় বিশেষ কোনো গ্রামে বসে মেলা। মেলাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনা-বেচা হয়। ঘর গৃহস্থালির সব রকমের জিনিসপত্র ডালা কুলা বটি কাঁচি আসবাবপত্র মাটির হাঁড়ি পটার ধান চাল সহ সবধরনের শস্য পাওয়া যায় মেলায়। বিশেষ করে মসলা জাতীয় সব শস্য পাওয়া যায়। যেমন- হলুদ মরিচ ধনিয়া জিরা আদা রসুন পেঁয়াজ। এই যে কয়েক গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে উৎসব আমেজে মেতে ওঠে তাদের কি জাতপাত আছে! কেউ খোঁজে কখনো? খোঁজে না। সবাই মানুষ। পরিচয় একটাই। এই বৈশাখ আমাদের একত্রিত হবার বার্তা দেয়। বাঙালি হবার অনুপ্রেরণা যোগায়। জাতীয় ভাবে ঐক্যবদ্ধ হবার সবচেয়ে শক্তিশালী আয়োজন এই বৈশাখ।  বৈশাখী মেলায় লোকসংগীত পালাগানের আসর বসে। বাউল ভাটিয়ালি গান গেয়ে আসর মাতায় নামি-দামি শিল্পী থেকে পাড়া-মহল্লার টংদোকানশিল্পী। কি আনন্দের অনুভূতি বোঝানোর ভাষা নেই! সেই মিলন মেলাগুলো হাড়িয়ে যেতে বসেছে। আমার মনে আছে ৫/৬ মাইল হেটে আমরা মেলায় যেতাম সার্কাস দেখতে। মেলা উপলক্ষে সার্কাস চলতো সপ্তাহব্যাপী। জীবনে প্রথম রয়েল বেঙ্গল টাইগার হাতি হরিন দেখেছি সার্কাসে। জানিনা এসব পেশায় যারা যুক্ত ছিলেন তাদের পরিবারকে আজ কি মূল্য দিতে হচ্ছে! সেই দিনগুলো ফিরে আসতো যদি! আহ্ কিযে ভালো লাগতো-কি করে বলিৃ! আরেকটা ঘটনা মনে পড়ছে, হৃদয় বিদারক! আমরা মেলায় যাচ্ছি রাস্তার ধারে জটলা। তখন আমি কিশোর। আশির দশকের শুরুর দিকেই হবে। অনেক বেশি মানুষের ভীর ঠেলে এগিয়ে গেলাম। একজন মানুষ অঝড়ে কাঁদছে আর মাটিতে গড়াগড়ি করছে। কিছুই বলছে না। অনেক পিড়াপিড়ি করার পরে জানা গেলো লোকটার ২শ টাকা তিনফিতা নামের জুয়ারিরা ফাঁদে ফেলে মেরে দিয়েছে। তখন দিনমজুর হিসেবে কাজ করে ২০/২৫ টাকার বেশি পাওয়া যেতো না। ২শ টাকা জোগাড় করতে তার হয়তো ১০দিন অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়েছিল। হয়তো পরিবারের জন্য অনেক কিছু কেনার পরিকল্পনা ছিলো তার। শোকে মুহ্যমান মানুষটার জন্য আমরা কয়েকজন সামান্য কিছু টাকা তুলে দিয়েছিলাম উপস্থিত সকলের কাছ থেকে। বৈশাখ হোক অন্য কোনো মাস হোক বা কোনো উৎসব, কারো জীবন দূর্বিসহ না হোক। জীবন হোক আনন্দের।

বৈশাখ ঘিরে উৎসব চিরকাল বাঙালির হৃদয় থেকে পুরাতন সব জঞ্জাল আর অশুভ কিছু ছুরে ফেলে নতুনভাবে শুরু করার প্রত্যয়ে উদ্ভাসিত হোক। আমরা যেনো এই একটি মাত্র দিনে বাঙালি না সাজি-যেনো চিরকালের জন্য বাঙালি হই। একই সাথে এদিনের প্রথম আলোর রশ্মিতে দেশ এবং জাতির ললাট থেকে কেটে যাক সকল আধার! এই শুভ প্রত্যাশা। 

আরও পড়ুন

লেখক :

এস এম হুমায়ুন কবির

নির্মাতা ও জ্যেষ্ঠ চিত্র-সম্পাদক, অনুষ্ঠান বিভাগ, বাংলাভিশন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বৈশাখ এলো উদ্দাম উল্লাসে

বিজিবি চেকপোস্টে ৩৬ হাজার ইয়াবা ও প্রাইভেটকার জব্দ

আজ থেকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা  

পহেলা বৈশাখ আমাদের শেকড়ের উৎসব

কোম্পানীগঞ্জে ৩৬৭ বোতল বিদেশি মদসহ যুবক আটক

২০ এপ্রিল জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি বাগবাড়ীতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী : রুমন