ভিডিও সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:১৭ দুপুর

মঙ্গল শোভাযাত্রাই কি পহেলা বৈশাখের একমাত্র মোটিফ?

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষের অন্যতম কৃত্যাচার হচ্ছে- মঙ্গল/ বৈশাখী শোভাযাত্রা। এটি হাজার বছরের কোনো কালচার নয়। নিতান্তই হাল আমলে এর সৃষ্টি। বাংলাদেশে এর সূচনা হয় ১৯৮৯ সালে। বর্ষবরণের শোভাযাত্রা করতে গিয়ে- তৎকালীন সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ কিছু লৌকিক মোটিফ (চারুকর্ম পুতুল, হাতি, ঘোড়া, কুমির, পেঁচা, দৈত্য, রাক্ষস ইত্যাদি) সংযোজিত হয়। ট্যাবু ও টোটেমকেন্দ্রিক এসব মোটিফের বিশেষ প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। পৃথিবীর সকল জাতি-গোষ্ঠী এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মাঝে- তাদের প্রচলিত কালচারগুলিতে শত শত নয়, হাজার হাজার মোটিফ রয়েছে। বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে (বস্তুগত ও অবস্তুগত উভয়তেই) রয়েছে হাজার হাজার মোটিফ। বিশেষ বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপক সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অনুষঙ্গ ও প্রতিসঙ্গগুলিই মোটিফ নামে পরিচিত। বিশ্বের তাবৎ লোককথা নিয়ে আমেরিকান ফোকলোরবিদ স্টিথ টমসন কর্তৃক ৬ খন্ডের মোটিফ ইনডেক্স (১৯৩২-৩৩ এবং ১৯৫৫-৫৮) প্রণয়নের পর [অবশ্য এর আগে ফিনিশ ফোকলোরবিদ অ্যান্টি-আর্নে কর্তৃক টাইপ ইনডেক্স (১৯২৮) প্রণীত হয়] সারা বিশ্বে ফোকলোর চর্চায় ব্যাপকভাবে ‘মোটিফ’ শব্দটির প্রচলন ঘটে।

বাংলাদেশে প্রচলিত মঙ্গল/ বৈশাখী শোভাযাত্রা যেভাবে পালিত হয় (বিভিন্ন পশু-পাখির মুখোশ ও প্রতিকৃতি সহযোগে) তা নিয়ে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের একটি আপত্তি রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, “যেভাবে বাংলাদেশে মঙ্গল/ বৈশাখী শোভাযাত্রা পালিত হয় তা বাংলাদেশের বৃহত্তর মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না।” বৈশাখী শোভাযাত্রা এখন যে কাঠামোয় দাঁড়িয়ে আছে- (তার একটি বিশেষ ভোক্তা বা প্রদায়ী ও গ্রহিতা আছে) তা থেকে যে এটি রোহিত হবে- সে সম্ভবনা কম। সরকারি বা রাষ্ট্রীয়ভাবে এটি বাতিল করাও সম্ভব নয়। তবে কীভাবে এটি সর্বজনীন হতে পারে? মনে রাখতে হবে, বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বিশেষ কোনো দল/ গোষ্ঠী/ শ্রেণির একক কোনো সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সকল মানুষের রয়েছে এর প্রতি অধিকার। এর একটি পক্ষ আছে আবার একটি বিপক্ষ শক্তিও আছে। দুয়েরই হাজার বছরের মৌলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এক ও অভিন্ন। দুপক্ষই প্রতিদিনই তিনবেলা না হোক অত্যন্ত দুইবেলা ভাত খান, রুটি খান। পুরোটা গ্রীষ্মকালজুড়ে সকালে পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে পান্তা খান, মাঝে মাঝে আলুঘাটি জাতীয় খাবারও খান। তারা নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য এবং মৌলিক উৎপাদনের জন্য জমিতে গরু-জোয়ালের সাহায্যে লাঙ্গল দেন, নিড়ানি দেন, কড়া রোদে পাটের জমিতে নিড়ানোর সময় বা ধান কাটার সময় ভাঙ্গা গলাতেও গান ধরেন, ধান মাড়াই করেন এবং এসব কাজে নানা ধরনের যন্ত্র ও প্রযুক্তির সাহায্য নেন। যেমন- লাঙ্গল, জোয়াল, মই, নাংলে, ঢ্যালভাঙ্গা, কোদাল, কুড়াল, খন্তা, পান্টি, কাড়াল, কুলা, হোচা, ডাবর, ধামা, ঝাঁকা ইত্যাদি।

এরপর আসি তাদের গার্হস্থ্য জীবন প্রসঙ্গে। ধান রোপন এবং কাটার কাজটি পুরুষরা করলেও- মাড়াই কাজে এবং ধান থেকে চাল প্রসেসের কাজটি (ঢেঁকির সাহায্যে), খাদ্য তৈরি- প্রভৃতি কাজ নারীরা করে থাকে। প্রত্যেকটি গ্রামের বাড়িতে (এমন কি শহরেও) গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, কবুতর ইত্যাদি গৃহপালিত পশু-পাখি দেখা যায়। প্রায় বাড়িতে আছে পুকুর। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে বাস্তুসংস্থানের বিকাশ ঘটেছে- নদী, নালা, খাল, বিল, জলা, ডোবাকে কেন্দ্র করে। জীবন ধারণের অন্যতম উৎস-পানি। খাওয়া, গোসল, কাপড় ধোয়া, গরু-ছাগলের স্নান এবং মৎস্য আহরণ, এজন্য কতশত রকমের জাল ও যন্ত্রের ব্যবহার- পলি/পলো, বস, দারকি, ধিয়ার, পেলা জাল, ও তৌরা জাল ইত্যাদি। আছে জমিতে সেচ দেয়ার একাধিক যন্ত্র- সেঁউতি, জোতা, স্যাচা, সেচনি ইত্যাদির ব্যবহার। এই গার্হস্থ্য ও জৈবনিক অভিজ্ঞতায় এদের জবানিতে বেড়িয়ে এলো- ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। অথবা- ‘মার‌্যা মাচ আজজ্যা ভাত’   (মেরে মাছ, রোপনে ভাত- বগুড়া)। 

আরও আছে- এই জনপদে (বাংলাদেশে) যারা বসবাস করে তাদের জীবনে আছে ছয়টা ঋতু। এর উপরেই নির্ভর করে তাদের বেঁচে থাকার উৎপাদনের সকল কৌশল। বৃষ্টি না হলে ফসল ফলে না। জীবন অচল- আবার অতি বৃষ্টিতে ও বন্যায় জীবন বাচাল। তাই উপায়ান্তর না পেয়ে- শেষে ‘আল্লাহ মেঘ দে/ পানি দে’; অথবা হুদুমের সাহায্য চাওয়া, ব্যাঙ্গের বিয়ে দেয়া অথবা জমিতে ইশরাকের নামাজ আদায় করা। সবগুলোর ফাংশন তো একটাই। সমস্যা দূর করা। এ জন্য তন্ত্র-মন্ত্র, দোয়া-দরুদ পড়া-শিরালিকে ডাকা; বৃষ্টি দূর করার জন্য- ‘কলা দিমু পুইরে/ বিষ্টি যা উইরে’- বলে গরম চুলায় আট্যাকলা পুড়া দেয়া (এটা এথনিক কালচার- এটাকে আপনি ফু দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারেন না)। অথবা জিন-ভূতে বিশ্বাস, তাবিজ, কবজ, মন্ত্র, দোয়া-দরুদ, ভোগ, মিলাদ- এসব থেকে কি মানুষ আজও মুক্ত হতে পেরেছে? অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমাদের বৈশাখের কৃত্যাচারে বা শোভাযাত্রায়- এই যে বাঙালির বৃহত্তর জীবন (৩৬৫ দিন/ ১২ মাস ও ৬ ঋতু) তার সংযোগ ঘটেনি। 

এখন প্রশ্ন হলো- পহেলা বৈশাখটা কী? একটি জনপদের বা বাংলাদেশের মানুষের দিন গণনায় ৩৬৫ দিনের প্রথম দিন। তো বছরের পয়লা দিন মানে কী? বছরের পয়লা দিন মানে সাইত্যার দিন, শুভ দিন। শুভ’র বিপরীত অশুভ ও শুভ’র সঙ্গেই থাকে (কেননা, ‘শুভ’ একটি বাইনারি শব্দ)। বণিক তাই এই সাইত্যের দিনে বাকি দিয়ে কুসাইত করতে চায় না। রাজা ও প্রজা সকলেই বণিক। সকলের আকাক্সক্ষা একই। ‘আগত বছরে আমাদের জীবনে যাতে অশুভ ভর না করে- তাই শুভকে বরণ আর অশুভকে তাড়ানোর ব্যবস্থা’। এটা হাজার বছরের এথনিক কালচার। এই চাওয়ার মাধ্যম বা ব্যবস্থাগুলি হচ্ছে- লোকসমাজের বিশেষ মোটিফ। পৃথিবীর সকল সমাজেই (ধর্মীয় বা এথনিক- হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চান বা আদিবাসী) শুভ/ অশুভ সংক্রান্ত শত শত নয়, হাজার হাজার মোটিফ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নববর্ষ নওরোজ এবং চাইনিজ নিউ ইয়ারে শুভ/অশুভ ছাড়াও তাদের জীবনাচারের শত শত মোটিফ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। আমাদের ‘বৈশাখী শোভাযাত্রায়’ যদি জনমানুষের বৃহত্তর সংস্কৃতির সংযোগ ঘটানো যায়- তবে এটি আপনিতেই সর্বজনীন রূপলাভ করবে। তখন আর কেউ বলতে পারবে না, পহেলা বৈশাখ পালন করা নাজায়েজ কাজ। 

আমাদের মনে রাখতে হবে, পহেলা বৈশাখ ঈদ বা পূজার মতো কোনো সাম্প্রদায়িক উৎসব নয়। অসাম্প্রদায়িকতাই এর বড় ভিত্তি। সুতরাং শুভ/অশুভ সংক্রান্ত প্রচলিত মোটিফের পাশাপাশি আমাদের ঋতুভিত্তিক যে গার্হস্থ্য জীবন এবং উৎপাদন কৌশল- সে সবকে সঙ্গী করে সমাজের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গে- বাস্তবিক- হাতি, ঘোড়া, মহিষ, গরু-বাছুর, হাঁস-মুরগি, ছাগল, কবুতর, লাঙ্গল, জোয়াল, মই, পান্টি, মাছ ধরার নানা রকমের জাল, দারকি-ধিয়ার, পলো, খলই, হোচা, টোপা, মাথাল, কুলা, চাঙ্গারি, বাউল, বয়াতি, টিকি, টুপি-তসবি, জায়নামাজ ইত্যাদি সহযোগে সারাদেশে যদি একই পদ্ধতিতে বৈশাখী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত/ পালিত হয়- তখন এটি এমনিতেই সর্বজনীন রূপ পাবে। মনে রাখতে হবে প্রতীকী বস্তু/প্রাণি থেকে জীবন্ত বস্তু/প্রাণির প্রতি মানুষের আকর্ষণ এবং সাংস্কৃতিক দ্যোতনা বেশি। 

আরও পড়ুন

শেষ কথায় বলতে চাই, সংস্কৃতি একটি চলমান প্রপঞ্চ। কালিক পরিক্রমায়, যুগের চাহিদায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সমাজ-সভ্যতার পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক ঘটনা। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রচলিত সংস্কৃতির অনেক কিছু হারিয়ে যায় বা বিলুপ্ত হয়। আবার নতুন অনেক কিছুই যুক্ত হয়। নবসৃজিত বিষয়গুলি লোকসমাজ গ্রহণ করলে তা ফোকলোরে পরিণত হয়। আবার ফোকলোরের কোনো কিছু যখন বিকৃতভাবে উপস্থাপিত ও পরিবেশিত হয়- তখন তার নাম হয় ‘ফেকলোর।‘ আমাদের নববর্ষ বা বৈশাখ যেন কখনো ফেকলোর না হয়। বৈশাখী শোভাযাত্রা বাংলাদেশের শতভাগ লোকসংস্কৃতি/ জাতীয় সংস্কৃতি হয়ে উঠুক-এই কামনা। 

লেখক :

বেলাল হোসেন

অধ্যক্ষ
সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারী মহিলা কলেজ
বগুড়া। 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নেত্রকোণায় পাচারকালে ১ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ

মঙ্গল শোভাযাত্রাই কি পহেলা বৈশাখের একমাত্র মোটিফ?

স্পষ্টতই ট্রাম্প মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন : সিআইএর সাবেক পরিচালক

অনন্য মাইলফলকে ম্যাক্সওয়েল

ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড ‘অত্যাচার’, সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত এরদোয়ানের

নলছিটিতে দুর্বৃত্তের হামলায় মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি নিহত