ভিডিও সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:৩৪ দুপুর

নদীমাতৃক দেশের নদী আজ অস্তিত্বের সংকটে

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। একসময় এ দেশের মানচিত্রজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে ছিল নদী, নালা, খাল ও বিল। কিন্তু সেই চিরচেনা প্রাকৃতিক রূপ আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমাগত নদী দূষণ, চর ও তীর দখল, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, খাল-বিল ভরাট করে শিল্পকারখানা ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এসবই দেশের নদী হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এসব কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, নাব্যতা দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং মৎস্য সম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। নদী থেকে আগত পলিমাটি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইভাবে দেশের মৎস্য খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নদীর অবদান অপরিসীম। দেশের অধিকাংশ জেলে নদী থেকেই মাছ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ নদী, খাল ও বিল চরম হুমকির মুখে। দিন দিন এসব জলাধারের সংখ্যা ও কার্যকারিতা কমে আসছে। দিনাজপুরের শাখা যমুনা নদী পলি জমে ভরাট হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। খননের অভাবে সেখানে বছরের বেশিরভাগ সময়ই পানি থাকে না। টাঙ্গাইলের লৌহজং, রংপুরের ঘাঘট, দিনাজপুরের শাখা যমুনা এবং খুলনার গ্যাংরাইল ও শৈলমারী নদী একসময় খরস্রোতা হলেও বর্তমানে পলি জমা, দখল ও দূষণের কারণে মৃতপ্রায়। কোথাও নদী খালে পরিণত হয়েছে, কোথাও আবার শুকনো বালুচরে রূপ নিয়েছে। 

ঝিনাই নদী দখল ও দূষণের কারণে প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে; স্থানীয় জনগণের কাছে এটি এখন কেবল স্মৃতির অংশ। এসব নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে শুধু মাছের আকালই দেখা দিচ্ছে না, বরং জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং কৃষকদের জীবন-জীবিকার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমতাবস্থায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে নদী, খাল ও বিলের নাব্যতা রক্ষা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এসব আইন জলাধার ভরাট, দখল ও দূষণ প্রতিরোধের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। 

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী, জলাধার ভরাটের অপরাধে প্রথমবার সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদন্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে। পরবর্তী অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যূনতম দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ দশ বছর কারাদন্ড অথবা দুই লাখ থেকে দশ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দন্ডণ্ড দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী কোনো নদী, খাল, বিল বা জলাশয় ভরাট করা সম্পূর্ণ বেআইনি, যার শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ডণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদন্ডণ্ড অথবা উভয় দন্ড। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, জনবলের সংকট এবং আইনের প্রয়োগহীনতার কারণে এসব আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ফলে অবৈধ দখল ও ভরাট বন্ধ করা যাচ্ছে না। যদিও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে এ বিষয়ে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তবুও এর কার্যকারিতা আরও জোরদার করা জরুরি। নদী রক্ষা মানেই পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা। তাই নদী, খাল ও বিল সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। 

লেখক :

আরও পড়ুন

তাকবির জাহান

শিক্ষার্থী ,আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, 
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় । 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণিল আয়োজনে নববর্ষ বরণ করবে ছাত্রদল

মেহেরপুরে ধর্ষণ মামলায় যুবকের যাবজ্জীবন

নদীমাতৃক দেশের নদী আজ অস্তিত্বের সংকটে

ছেলেসহ ৩ জনকে কুপিয়ে ছাদ থেকে লাফিয়ে কনস্টেবলের মৃত্যু

কসবায় ইয়াবা সেবনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় যুবকের গোপনাঙ্গে কামড়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নববর্ষে ছাত্রশিবিরের কোনো আয়োজন নেই