পহেলা বৈশাখ ও বগুড়ায় ইলিশের ‘বাজারনামা’
আবারও দুয়ারে কড়া নাড়ছে পহেলা বৈশাখ। পঞ্জিকার পাতা উল্টে ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ১৪৩২ বঙ্গাব্দের বিদায়বেলা, কাল সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই শুরু হবে নতুন এক পরিক্রমা। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব এই নববর্ষ।
আর এই উৎসবের অনুষঙ্গ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে আমাদের ওপর সওয়ার হয়ে আছে ‘পান্তা-ইলিশ’ সংস্কৃতি। যদিও এর ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে, তবুও সাধারণ মানুষের মনে বৈশাখ আর ইলিশ যেন এখন সমার্থক। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ায় বৈশাখী আবহ মানেই সাতমাথার মোড়ে ভিড়, পৌর এ্যাডওয়ার্ড পার্ক (পৗর পার্ক) বৈশাখি মেলা আর বাজারগুলোতে ইলিশ কেনার ধুম।
ইলিশের বাজারে আগুনের উত্তাপ
বগুড়ার বাজারগুলোর বর্তমান চিত্র দেখলে মনে হতে পারে, ইলিশ মাছ কেবল একটি জলজ প্রাণী নয়, বরং এটি আভিজাত্যের এক দুর্মূল্য প্রতীক। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বগুড়ার মাছ বাজারের একটি ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, ইলিশের দামে রীতিমতো ‘আগুন’ লেগেছে। ক্রেতাদের ভিড় উপচে পড়ছে, কিন্তু মাছের দাম শুনে অনেকেরই কপালে চিন্তার ভাঁজ।
গতরাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদরে ভিডিওর তথ্যানুযায়ী, বগুড়ার রেলওয়ে বাজার, বড় বাজার( ফতেহ আলী বাজার), ও চেলোপাড়া মৎস্য আড়তগুলোতে ইলিশের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকলেও চাহিদার কোনো কমতি নেই।
এক কেজি বা তার চেয়ে একটু বড় সাইজের ইলিশের দাম হাকা হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। মাঝারি মানের ইলিশও ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার নিচে মিলছে না। মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠলেও পহেলা বৈশাখের মেনুতে অন্তত এক টুকরো রূপালি ইলিশ রাখতে মরিয়া শহরবাসী। বিক্রেতারা বলছেন, “সরবরাহ কম, কিন্তু বৈশাখের কারণে চাহিদা বেশি, তাই দাম একটু চড়া।”
ঐতিহ্য নাকি হুজুগ?
পান্তা-ইলিশের এই প্রচলন নিয়ে প্রতি বছরই বিতর্ক ওঠে। গবেষকদের মতে, গ্রামীণ বাংলার কৃষক পরিবারে পান্তা খাওয়ার চল থাকলেও তার সাথে ইলিশের সংযোগ ছিল না। ইলিশ মূলত বর্ষাকালের মাছ। কিন্তু নববর্ষের এই গরমে জোর করে ইলিশ খাওয়ার এই চলটি আশি ও নব্বইয়ের দশকে মূলত শহুরে সংস্কৃতি থেকে শুরু হয়েছে। এখন তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বৈশাখের সময় জাটকা নিধন ও ইলিশ সংরক্ষণের যে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় এই আকাশচুম্বী চাহিদা।
বগুড়ার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, উৎসব হোক মনের আনন্দে, বাজারের দাপটে নয়। বাঙালির সংস্কৃতির শেকড় অনেক গভীরে, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট মাছের টুকরোয় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
আরও পড়ুনবগুড়ার বৈশাখী আবহ
বগুড়া বরাবরই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সমৃদ্ধ। বাংলা নতুন বছরের এই সূচনায় আগামীকাল, মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখ হতে পাঁচ বৈশাখ; ১৪ এপ্রিল হতে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত পৌর পার্ক এবং শহীদ টিটু মিলনায়তন চত্বরে শুরু হচ্ছে বগুড়া সাংস্কৃতিক ফোরাম ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বগুড়া পৌরসভা, জেলা পরিষদ বগুড়ার সহযোগিতায় শুরু হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা।
বগুড়ার সাধারণ মানুষ যারা প্রতিদিনের ডাল-ভাত জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে, তাদের কাছে ২ হাজার টাকা কেজি দরের ইলিশ এক বিলাসিতা মাত্র। তবুও হুজুগে বাঙালি পিছিয়ে নেই। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বগুড়ার মিষ্টান্ন ভাণ্ডারগুলোতেও উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দই-মিষ্টির ঐতিহ্যবাহী এই জনপদে বৈশাখী আমেজ যেমন আছে, তেমনি আছে উচ্চমূল্যের এক চাপা দীর্ঘশ্বাস।
শেষ কথা
পহেলা বৈশাখ মানেই তো নতুনকে বরণ করে নেওয়া, পুরনো জঞ্জাল ধুয়ে ফেলা। আমাদের উৎসব হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক। ইলিশের দুষ্প্রাপ্যতা বা আকাশচুম্বী দাম যেন নববর্ষের আনন্দকে ম্লান না করে দেয়। বৈশাখের সকালে পান্তার সাথে ইলিশ থাকতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে এসে আমরা যদি গ্রাম-বাংলার প্রকৃত ঐতিহ্য যেমন—নানা পদের ভর্তা, শাক আর পিঠা-পুলিকে প্রাধান্য দেই, তবেই হয়তো উৎসবের সার্বজনীনতা রক্ষা পাবে।
নতুন বছর আমাদের জীবনে নিয়ে আসুক ইতিবাচক পরিবর্তন। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়া যেমন ঐতিহ্যে অটল, তেমনি আধুনিকতার দৌড়েও সমানতালে চলুক। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩!
হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
মন্তব্য করুন









