লেজুড়বৃত্তি রাজনীতি পরিহার করা অত্যাবশ্যক
আমার দেখা রাষ্ট্রীয় একটি ব্যাংকে চাকুরী করা এমএলএস পদে একজন নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারীর ঔদ্ধ্যতপূর্ণ আচরণ। তিনি একজন দলীয় লেজুরবৃত্তি সংগঠনের সেক্রেটারি। খোদ ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজারের টেবিলের সামনে চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে জিএম এর টেলিফোনে একর পর এক কথা বলেই যাচ্ছে। সময়টা দেখা হয়নি, তবে মনে হলো মিনিট চল্লিশেক হবে। ও চলে যাওয়ার পরে আমি জিএম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম, একজন পিওন হয়ে আপনার সামনে আপনার টেলিফোন ব্যবহার করে এত দীর্ঘ সময় কথা বললো আপনি কোন কিছু বললেন না। শুধু বললেন ভাই বলার আর কি আছে, কিছু বললে আমার এই চেয়ারে থাকা মুসকিল হয়ে যাবে। উনার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাহলে বড় কর্তাদের ক্ষমতা কি নিম্নমুখী ?
সরকারি অফিসে লেজুড়বৃত্তি রাজনীতি পরিহার করা অত্যাবশ্যক, কারণ এটি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নষ্ট করে এবং জনসেবাকে ব্যাহত করে। সরকারি কর্মচারীরা রাজনৈতিক দলের ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য। রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন বা পদোন্নতি না হলে যোগ্য কর্মীরা স্থান পায়, যা কর্মদক্ষতা বাড়ায়। লেজুড়বৃত্তি দলীয় সংগঠন না থাকলে কর্মীরা দলের পরিবর্তে কাজের প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। দলীয় সংগঠন না থাকলে অফিসের কাজের পরিবেশ বেশি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল হবে। দলীয় প্রভাবমুক্ত পরিবেশে কর্মীরা বেশি দক্ষ এবং উৎপাদনশীল হতে পারবেন। অফিসগুলোতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। কর্মকর্তাদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব কম হবে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হবে।
আনেক দিন আগের কথা বগুড়া জেলার তৎকালীন একজন সুযোগ্য জেলা প্রশাসক বদলী হয়ে সচিবালয়ে যোগদান করেন। সচিবালয়ে একদিন উনার সাথে দেখা। আমাকে চা পানের অফার করলেন। অফারটি সাদরে গ্রহণ করে উনার কামরায় বসলাম। যথারীতি কলিং বেল টিপলেন। কিন্তু কোন সাড়া মিললো না। আবার কলিংবেল টিপলেন। দীর্ঘ চল্লিশ মিনিট অপেক্ষার পর বললেন, আমার সাপোর্টিং স্টাফ খুব পাওয়ারফুল। একটি সংগঠনের সহ-সভাপতি। মনে হয় দলীয়কাজে ব্যস্ত আছে। দুঃখিত আপনাকে চা খাওয়াতে পারলাম না। অন্য একদিন আসবেন। আমি ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিলাম। আমি আশ্চর্য হয়নি। লেজুড়বৃত্তি রাজনীতির কারণে এই রকম হওয়াটায় স্বাভাবিক।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি ধরে রাখতে পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই। কর্মকর্তাদের সবার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে হবে। যাতে একটি সুন্দর কর্মপরিবেশ বা আবহ বিরাজ করে। সরকারি ও কর্পোরেট অফিসগুলোতে দলীয় সংগঠন নিষিদ্ধ করার জন্য আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। অফিসগুলোতে দলীয় সংগঠন নিষিদ্ধ করার জন্য কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। অফিসগুলোতে দলীয় সংগঠন নিষিদ্ধ করার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি হয় যা রাজনৈতিক দলের শিক্ষকেরা নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করতে কাজে লাগান। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য, শিক্ষকদের মূল কাজ শিক্ষকতা ও গবেষণা বাদ দিয়ে তারা ছাত্রসংগঠনের ক্যাডারদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। এতে তাদের মান সম্মান ধুলায় মিশিয়ে দিতেও তারা কার্পণ্য করেন না। আমার এই লেখায় শিক্ষক সমাজের সদস্যগণ মনে আঘাত পেলে,আমাকে ক্ষমা করবেন। সমালোচনা নয়, উন্নত ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকাটাই মুখ্য বিষয়। উন্নত দেশগুলোতে আমরা দেখি শিক্ষকদের পরিচয় হলো, কোন শিক্ষক গবেষণায় কতটা ভালো, কোন শিক্ষক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কী কী অবদান রেখেছেন, কোন শিক্ষক কতটা ভালো পড়ান, কোন শিক্ষক কতটা ছাত্রবান্ধব, কোন শিক্ষকের গবেষণা নেটওয়ার্ক কত বড়, কোন শিক্ষক কতটি ‘গবেষণা অনুদান’ পেয়েছেন ও কতজন ছাত্রকে সুপারভাইজ করেছেন, ইত্যাদি। জাতীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিজেদের দায়দায়িত্ব ভুলে গিয়ে, পড়াশোনা বাদ দিয়ে, গবেষণা না করে, ছাত্রদের সময় না দিয়ে, বরং ডিন, সহ-উপাচার্য আর উপাচার্য হতে, শিক্ষক সমিতির পদ পেতে, সিন্ডিকেট সদস্য হতে বেশী ব্যস্ত। কোন শিক্ষক কোন দলের, এটাই আজ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পরিচয়। তাই জাতীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষকরাজনীতিও বন্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন
আধুনিক সমাজে গণমাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম। যে কারণে সাংবাদিকদের পেশাদারি মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা, একজন সাংবাদিকের ঈমানী দায়ীত্ব। বর্তমানে সময় এসেছে সাংবাদিকতার দিক পরিবর্তনের। তার মধ্যে অন্যতম হলো রাজনৈতিক মুক্ত সাংবাদিক সমাজ গড়ে তোলা। বিগত সময়ে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনে সাংবাদিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের ক্রান্তিলগ্নে সাংবাদিকরা সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। গোটা কয়েক রাজনৈতিক সাংবাদিকের কারণে চরম বিতর্কের মধ্যে পড়েছে গোটা সাংবাদিক সমাজ। সংবাদমাধ্যমের কাজ বিশ্লেষণাত্মক, যুক্তিশীল,অন্তর্ভুক্তিমূলক সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করা। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বর্তমানে সাংবাদিকদের ভিতরে কোন না কোন রাজনৈতিক দলের মানসিকতা বিরাজ করায় সততার সাথে সাংবাদিকতা করার জন্য বিরাট এক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিরা কোনো দলের অঙ্গ সংগঠন বা রাজনৈতিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকলে তা সংবিধান ও বিদ্যমান আইনের পরিপন্থী। তাই, জনসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি অফিসসমূহকে দলীয় ও অঙ্গ সংগঠনের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা অপরিহার্য। এটি পেশাদারিত্ব নষ্ট করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করে এবং নাগরিকদের সেবা পাওয়ার পরিবর্তে দলীয় অনুগতদের প্রাধান্য নিশ্চিত করে। এই ধরনের প্রভাব সরকারি চাকুরিবিধি ও সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিপন্থী, যা প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি তৈরি কেরে। দলমত নির্বিশেষে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত সকল ব্যক্তিরা তাদের নিজস্ব সংগঠন শক্তিশালী করা প্রয়োজন। যার মাধ্যমে নিজ কর্মপরিবেশ, শৃ্খংলা বজায় রাখা, জনসেবা প্রদান নিশ্চিত করা। নিজেদের সঠিক দাবী দাওয়া নিয়ে সরকারের সাথে গঠনমূলক আলোচনা করে সমাধান বের করাই উত্তম কাজ।
দলীয় পরিচয়ে পদোন্নতি বা পদায়নের ফলে অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়, যা কাজের মান কমিয়ে দেয়। দলীয় ছত্রছায়ায় কর্মকর্তারা প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার তোয়াক্কা করেন না, ফলে সেবাগ্রহীতারা হয়রানির শিকার হন। দাপ্তরিক কাজের বদলে দলীয় স্বার্থসিদ্ধি, সুপারিশ বাণিজ্য ও প্রভাব বিন্তারে সময় ব্যয় হয়। দলীয় সংগঠন কাজের পরিবেশকে রাজনৈতিক আখড়ায় পরিণত করে, যা সাধারণ কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দেয় এবং কাজের গতি কমিয়ে দেয়। জনগণের কাছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে সরকারি অফিস থেকে দলীয় প্রভাব দূর করে, পেশাদারিত্ব ও কাজের মান পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখকঃ
মোঃ জিয়াউর রহমান
পরিবেশ সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








