মৌসুমের শুরুতেই শুষ্ক তিস্তা নদী, প্রয়োজন মত পানি মিলছেনা
গঙ্গাচড়া (রংপুর) প্রতিনিধি: রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। কোথাও কোথাও নদী পরিণত হয়েছে সরু পানির ধারায়। তিস্তা ব্যারাজে প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ কিউসেক। এতে ব্যহত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও সেচ কার্যক্রম। সংকটে পড়েছেন কৃষক, জেলে ও নৌকার মাঝিরা।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী এলাকায় খরস্রোতা তিস্তা নদী এখন হেঁটেই পার হচ্ছেন মানুষ। খেয়াঘাট কিংবা নৌকার অপেক্ষা না করে হাঁটুপানি পেরিয়ে নদীর চরে আবাদ করা ফসলের দেখভাল করতে যাচ্ছেন কৃষকেরা। সাধারণত চৈত্র মাসে নদীর বুকে বালুচর জেগে উঠলেও এবার কার্তিক মাসেই দেখা দিয়েছে বিশাল চর। স্থানীয়দের অভিযোগ, উজানে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় নদীটির এমন অবস্থা হয়েছে।
প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদীর উৎপত্তি ভারতের সিকিমে। এরপর পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। বাংলাদেশ অংশে নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৪ কিলোমিটার।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে তিস্তা ব্যারাজে প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ কিউসেক পানি। সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম ধরা হলেও নভেম্বর থেকেই নদীতে পানির প্রবাহ কমতে শুরু করে। উজানে ভারত ১৯৮৭ সালে গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণের পর পানি প্রত্যাহার শুরু করলে তিস্তা অববাহিকায় পানির সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, এক হাজার কিউসেকের কম পানি থাকলে তিস্তা ব্যারাজের সবকটি জলকপাট বন্ধ রেখেও সেচের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ভাটির এলাকায় নদীতে পানি ছাড়ারও সুযোগ থাকে না।
আরও পড়ুনসরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তা ব্যারাজের পানি নিয়ন্ত্রণে থাকা ৪৪টি জলকপাটের সবকটিই বন্ধ। ব্যারাজের ভাটিতে যত দূর চোখ যায়, শুধু বালুচর। কোথাও কোথাও দেখা যায় পানির ক্ষীণ ধারা। পানির অভাবে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক নৌকা বেঁধে রাখা হয়েছে। মানুষ নদী পার হচ্ছেন হেঁটে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন বংশপরম্পরায় নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা মাঝিরা।
ব্যারাজের ভাটিতে রংপুরের গঙ্গাচড়ার চিলাখালচর এলাকার বাসিন্দা কৃষক মফিজুল ইসলাম ও সেকেন্দার আলী জানান, কয়েক বছর আগেও তিস্তার পলি জমে তৈরি হওয়া চরে বিভিন্ন ফসল আবাদ করতেন তারা। নদীতে পানি থাকায় সেচের খরচও কম হতো। কিন্তু এখন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সেচযন্ত্র বসিয়ে ফসলে পানি দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর অনেকের কৃষিকাজের জায়গা হলেও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা জরুরি। তাই সবার আগে তিস্তা নদীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ অববাহিকার কোটি মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সেই প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছেন।
মন্তব্য করুন







