মোহাম্মদ নজাবত আলী
মাদক আমাদের সমাজকে ধ্বংস করছে
আমাদের সমাজটা দিন দিন বদলে যাচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে। এ বদলে যাওয়া বা পরিবর্তনের ধারাটা হওয়া দরকার ইতিবাচক। কিন্তু বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে তা দৃশ্যমান নয়। মাদক আমাদের সমাজকে ধবংস করছে। আজ পাড়া, মহল্লা, শহর, বন্দরে অনেকের হাতে মাদক। আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত যেসব নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে তার নেপথ্যে রয়েছে মাদক। এক শ্রেণির কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও মাদকে আসক্ত হয়েছে। খারাপ বন্ধুদের পাল-ায় পড়ে এ সমস্ত শিক্ষার্থী কখন যে আমাদের মনের আড়ালে, চোখের আড়ালে, মনের অজান্তে বিভিন্ন মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে তা আমরা জানি না। কিশোরগ্যাং ক্রমাগতভাবে ভয়ংকর হয়ে ওঠছে। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মাদক ও অনলাইন জোয়ার আসক্তি থেকে পারিবারিক কলহে তারা কোমলমতি শিশুদের সহজে টার্গেট করছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, 'চলতি বছরের প্রথম আট মাসে হত্যার শিকার হয়েছে ২৩৩ শিশু। এর মধ্যে নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ জনের। ও শারীরিক নির্যাতনে নিহত ৬৮ এবং পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে নিহত ৪৯ জন। একই সময় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার শিকার হয়েছে ২৮ জন শিশু'। আট মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৭০৯ জন শিশু। ধর্ষণ করা হয়েছে ২৭৭শিশুকে। (আঃ সময় ২১ সেপ্টেম্বর) এমনকি আপন পিতামাতাও সন্তানকে হত্যা করছে। হত্যার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় শিশু হত্যা দিন দিন বাড়ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, কিশোরগ্যাং মাদকের অবাধ ব্যবহার সাইবার দুনিয়ার প্রতি নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তি- এসব বিষয় শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো নৃশংসতা তৈরি করছে। পারিবারিক সম্পর্ক শিথিল হওয়ার তিক্ততা, বেকারত্ব, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবে দিন দিন মাদক আসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। মাদক যেহেতু বিনামূল্যে পাওয়া যায় না তাই উঠতি বয়সের ছেলেরা পিতার পকেট চুরি এমনকি ছিনতাই করেও অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা নানা ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।
মাদক সেবনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় ১৫ থেকে ৩০বছরের বয়সীদের মধ্যে। মাদকসেবীর মধ্যে ৮০ শতাংশই তরুণ-তরুণী। তাদের ৪০ শতাংশ আবার বেকার। এদের ৫০ শতাংশ অপরাধের সঙ্গে জড়িত। বিগত বছরগুলোতে মাদক বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভি-ন্ন দেশে ভয়াবহ নেশায় পরিণত হয়েছে। মাদক বর্তমান যুবসমাজকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে এর পরিণতি কি এবং এ সর্বনাশা নেশা থেকে বেরিয়ে আসা অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, হতাশাগ্রস্ত, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি সমাজের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানরাও মাদকে আসক্ত। মাদকাসক্ত স্বামীর হাতে স্ত্রী, ভাইয়ের হাতে ভাই, এমনকি ছাত্রের হাতে শিক্ষকও খুন হচ্ছে।
শিশু হত্যা নির্যাতনের এসব ঘটনায় অভিভাবকদেরও মধ্যে নান-াধরনের উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় পরিবার ও রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না। মাদকই হত্যা খুনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মাদকাসক্তের হাতে কেউ শারীরিকভাবে নির্যাতন বা হত্যার শিকার হচ্ছে। আবার কেউ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট চুবি, ছিনতাই, মারামারি ও ধর্ষণসহ পারিবারিক সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
আরও পড়ুনসমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ তৌহিদুল হক বলেন, মাদকাসক্ত এমন এক অপরাধ যার মাধ্যমে অনেক অপরাধের সৃষ্টি হচ্ছে। এটি চুরি, ছিনতাই এবং হত্যাকান্ডের মত গুরুতর অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। মাদকের কারণে পারিবারিক শৃঙ্খলা নষ্ট এবং যুব সমাজের কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের একমাত্র পথ হচ্ছে, সীমান্ত দিয়ে দেশে কোনো মাদক ঢুকতে না দেয়া।
পরিশেষে বলা যায় মাদকাসক্তি কোনো সাধারণ ব্যক্তিক সমস্যা নয়; বরং এটি একটি তীব্র সামাজিক ব্যাধি ও সকল অপরাধের উৎস। মাদকের ছোবলে আজ ধবংস হচ্ছে উদীয়মান যুবসমাজ, বিঘ্নিত হচ্ছে পারিবারিক শান্তি এবং সংকুচিত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। বলা যায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, এমনকি শিশু হত্যার মত গুরুতর অপরাধের পিছনে প্রধান প্ররোচক হিসাবে কাজ করে মাদক। তাই মাদক যেহেতু বিভিন্ন অপরাধের জন্ম দিচ্ছে, সেহেতু মাদকের প্রবেশদ্বারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়াতে হবে। মাদক সেবন তো অপরাধ। তাই একটি অপরাধ যেন অন্য কোনো গুরুতর অপরাধের জন। দিতে না পারে এ বিষয়ে সীমান্তরক্ষাকারী বাহিনীকেও আরো সতর্ক ও তৎপর হওয়া প্রয়োজন।
লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক [email protected] ০১৭১৯-৫৩৬২৩১
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1790401227.jpg)
_medium_1790225997.jpg)
_medium_1789968649.jpg)

_medium_1789800085.jpg)
_medium_1789539639.jpg)
_medium_1790488384.jpg)

