ভিডিও শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ : ১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:২৩ এএম

এজেন্টিক এআই এবং আমাদের নতুন লড়াই

মোঃ রেজাউল করিম রাজু :  যে প্রযুক্তির হাত ধরে মানবসভ্যতা আজ এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে, যে প্রযুক্তির আশীর্বাদে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজে এসেছে অবিশ্বাস্য গতি এবং সাশ্রয় হয়েছে মহামূল্যবান সময়ের, সেই প্রযুক্তিই আজ এক নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। বিগত কয়েক দশকে এই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়ে দেখিয়েছে ভবিষ্যতের এক সোনালী আশার আলো। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো, সেই আশীর্বাদ স্বরূপ প্রযুক্তিই আজ মানুষের জন্য, বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের সাথে জড়িত প্রতিটি মানুষের জন্য নতুন করে এক গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রযুক্তি জগতের একজন সিনিয়র আইটি প্রধান হিসেবে এবং দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের একটি স্বনামধন্য দৈনিকের আইটি বিভাগ পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে আমি এই পরিবর্তনগুলোর খুব কাছ থেকে সাক্ষী হচ্ছি। আমি প্রতিদিন দেখছি কিভাবে প্রযুক্তিপ্রেমী ও আইটি পেশাদারদের মানসিকতায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। আসলেই এখন কী করা উচিত? আর কী বা না করা উচিত?

প্রতিটি ক্ষেত্রেই, প্রযুক্তির সাথে জড়িত প্রতিটি মানুষেরই বর্তমানে এই একই মানসিক অবস্থা তৈরি হয়ে রয়েছে। সবার ভেতরেই এক ধরনের চাপা আতঙ্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা কাজ করছে। আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে, প্রযুক্তি বলতে আমরা আসলে কী বোঝাই। অনেকেই মনে করেন প্রযুক্তি মানেই শুধু একটি মনিটর, কিবোর্ড আর কম্পিউটার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি বলতে শুধু নির্দিষ্ট কোনো হার্ডওয়্যার বা কম্পিউটারকে বোঝায় না। প্রযুক্তি বলতে বোঝায় এমন সবকিছু যা কোনো না কোনো স্বয়ংক্রিয় বা ডিজিটাল সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা, কুরিয়ার সেবার ফ্রড চেকিং সিস্টেম, আধুনিক ওয়েব হোস্টিং বা সার্ভার কন্ট্রোল প্যানেল সবকিছুই এই প্রযুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই পুরো ইকোসিস্টেম বা বিশাল ব্যবস্থাপনা আজ এক অভাবনীয় চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

এই চ্যালেঞ্জের মূল কারণটি হলো অত্যাধুনিক 'এজেন্টিক এআই' বা স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বিকাশ। আমরা বর্তমানে ২০২৬ সালের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে অবস্থান করছি। এই ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে আমরা এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর যে অভাবনীয় এবং যুগান্তকারী অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি, তা রীতিমতো গায়ের লোম দাঁড় করিয়ে দেওয়ার মতো। প্রথম দিকের এআইগুলো শুধুমাত্র আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিত বা কিছু তথ্য সাজিয়ে দিত। কিন্তু বর্তমানের এজেন্টিক এআই সেখানে সীমাবদ্ধ নেই। এরা এখন মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে, নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কোড লিখতে পারে, ভুল ধরতে পারে এবং একা একাই পুরো একটি প্রজেক্ট দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারে। একজন দক্ষ মানুষ যে কাজটি করতে কয়েক দিন সময় নিতেন, এই এজেন্টিক এআই তা মাত্র কয়েক মিনিট বা সেকেন্ডের মধ্যে নিখুঁতভাবে করে ফেলছে।

এই পরিস্থিতি আমাদের দেশের তরুণ আইটি পেশাদারদের জন্য এক বিশাল চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইটি সেক্টর আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বড় একটি চালিকাশক্তি। ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে লোকাল সফটওয়্যার ফার্ম—সবখানেই আমাদের হাজার হাজার মেধাবী তরুণ কাজ করছেন। কিন্তু যখন একটি এআই সিস্টেম নিজে থেকেই ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে, লোগো বা গ্রাফিক ডিজাইন করতে পারে, এমনকি সার্ভারের জটিল ব্যাকআপ সিস্টেম নিজে থেকেই সামলাতে পারে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—মানুষের কাজের জায়গাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্রগতি আরও কতটা উন্নত এবং কতটা অত্যাধুনিক হতে পারে, তা কল্পনা করাও এখন এক চরম কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যদি একটু পেছনের দিকে তাকাই, তবে দেখব মাত্র কয়েক বছর আগেও যা ছিল শুধুই কল্পবিজ্ঞান, আজ তা আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। তাহলে ২০২৮ বা ২০২৯ সালে প্রযুক্তির রূপ কেমন হবে? তখন কি মানুষের আদৌ কোনো প্রয়োজন থাকবে, নাকি সব কাজই এআই একাই সামলে নেবে? এই প্রশ্নগুলোই আজ আইটি এক্সপার্ট থেকে শুরু করে সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সবার রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।

আরও পড়ুন

তবে একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে এই পুরো বিষয়টিকে আমি শুধু অশনিসংকেত হিসেবে দেখতে রাজি নই। এটা সত্য যে, বাজার এবং কাজের ধরন মারাত্মকভাবে পরিবর্তন হচ্ছে। যে কাজগুলো গতানুগতিক এবং মুখস্থবিদ্যার মতো, সেগুলো খুব দ্রুত এআইয়ের দখলে চলে যাবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই ফুরিয়ে যাবে। প্রতিটি বড় পরিবর্তনের সময়ই এমন একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। যখন কম্পিউটারের প্রথম প্রচলন শুরু হয়েছিল, তখনও অনেকে ভেবেছিলেন মানুষের আর কোনো কাজ থাকবে না। কিন্তু বাস্তবে কম্পিউটার আরও নতুন নতুন কোটি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছিল।

বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মানসিকতার পরিবর্তন। "কী করা উচিত আর কী না করা উচিত" এই দ্বিধা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের নতুন প্রযুক্তিকে আপন করে নিতে হবে। যে এআই আজ আমাদের ভয়ের কারণ, সেই এআইকেই আমাদের হাতিয়ার বানাতে হবে। আমাদের তরুণদের এখন শুধু কোড লেখা বা সাধারণ ডিজাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তাদেরকে এআই সিস্টেম পরিচালনা করা শিখতে হবে। এজেন্টিক এআই নিজে নিজে কাজ করতে পারলেও, তাকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়া, তার কাজের মান যাচাই করা এবং তাকে দিয়ে বড় কোনো ব্যবসায়িক বা সামাজিক সমস্যার সমাধান করানোর জন্য একজন দক্ষ মানুষের মস্তিষ্কই প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশের আইটি সেক্টরকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি 'ক্রিটিক্যাল থিংকিং' বা বিশ্লেষণমূলক চিন্তাধারার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। এআই হয়তো খুব সুন্দর একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিতে পারবে, কিন্তু সেই প্ল্যাটফর্মটি এদেশের মানুষের আবেগ, তাদের প্রয়োজন এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা কেবল একজন মানুষই বুঝতে পারবে।

পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প হতে পারে না, বরং এটি মানুষের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলার একটি মাধ্যম মাত্র। ২০২৬ সালের এই এজেন্টিক এআইয়ের বিপ্লব আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে আমরা পিছিয়ে পড়ব। তাই ভয় না পেয়ে, দুশ্চিন্তায় সময় নষ্ট না করে, নতুন এই প্রযুক্তির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তবেই আমরা এই নতুন যুগে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারব এবং বাংলাদেশের আইটি খাতকে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে সক্ষম হব। ভবিষ্যৎ তাদের জন্যই সুন্দর, যারা ভবিষ্যতের পরিবর্তনের সাথে নিজেকে প্রস্তুত করতে জানে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এজেন্টিক এআই এবং আমাদের নতুন লড়াই

জামায়াতে দলীয় লেজুড়বৃত্তির কোনো সুযোগ নেই : গোলাম পরওয়ার

তিস্তা নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি নতুন করে বন্যার আতঙ্ক, সতর্কতা জারি

ডাকাতি হওয়া ২৪ লাখ টাকার সয়াবিন তেল বগুড়ার শেরপুর থেকে উদ্ধার চালক সহ গ্রেফতার -২

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে পুলিশের পৃথক অভিযান, ২১৭ বোতল এস্কাফ ও গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেফতার

বগুড়ার শাজাহানপুরে ৩ বছর যাবত বিদ্যালয় মাঠ জলাবদ্ধ : মিলছেনা সমাধান