ভিডিও রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৮ জুন, ২০২৬ ০৬:৩২ পিএম

নীল সমুদ্রে সবুজ বিপ্লব: গ্রিন শিপিংয়ের সম্ভাবনা

নীল সমুদ্রে সবুজ বিপ্লব: গ্রিন শিপিংয়ের সম্ভাবনা, ছবি: সংগৃহীত।

বিশ্ব মানচিত্রের তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। এই বিশাল জলরাশি শুধু ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। বিশ্ব বাণিজ্যের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ সম্পন্ন হয় এই সমুদ্রপথে। কিন্তু রূপালি সমুদ্রের নীল জলরাশির আড়ালে জমা হচ্ছে এক কালো মেঘ। বিশালাকার সব বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, বর্জ্য পদার্থ, তেল ও প্লাস্টিক প্রতিনিয়ত আমাদের সমুদ্রের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। বিশ্বায়নের এই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাব কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, এটা এখন চরম বাস্তবতা। পরিসংখ্যান মতে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৩ শতাংশের দায় জাহাজ চলাচল খাতের। এই চরম ক্রান্তিকালে তাই বিশ্বজুড়ে চলছে কার্বন নিঃসরণ কমানোর এক মহাযজ্ঞ। শুরু হয়েছে নতুন লড়াই সমুদ্রকে বাঁচাতে সমুদ্রে ‘সবুজ বিপ্লব’। আন্তর্জাতিক পরিভাষায় এই বিপ্লবের পোশাকি নাম “গ্রিন শিপিং” বা পরিবেশবান্ধব নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা। 

সহজভাবে বললে, “গ্রিন শিপিং”-এর মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি না করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে আনা হয়। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর ঘোষণা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জাহাজ শিল্প থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ শূন্যের খাতায় আনতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশ্বের অনেক দেশ ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল, মিথানল, অ্যামোনিয়া কিংবা প্রাকৃতিক উৎস ব্যবহারে মনোযোগ দিচ্ছে। সমুদ্রের বুকে পরিবেশবান্ধব এই রূপান্তরই হলো আজকের ‘সবুজ বিপ্লব’। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ এবং এর রয়েছে দীর্ঘ সমুদ্রসীমার সুবিধা। আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই চলে এই পথে। চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর আমাদের অর্থনীতির ফুসফুস হিসেবে কাজ করছে। বিশ্ববাজারের এই পরিবর্তনের হাওয়া এদেশের অর্থনীতিতেও লেগেছে। 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবুজ বিপ্লবের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে জাহাজ ভাঙা বা রিসাইক্লিং শিল্প। একসময় পরিবেশবাদীরা সীতাকুন্ডের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলো নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ‘হংকং কনভেনশন’ অনুসমর্থন করার পর থেকে বদলে গেছে দৃশ্যপট। আমাদের ইয়ার্ডগুলো এখন আন্তর্জাতিক মানের ‘গ্রিন ইয়ার্ড’-এ রূপান্তরিত হচ্ছে। জাহাজ ভাঙার পাশাপাশি জাহাজ নির্মাণ বা ‘গ্রিন শিপবিল্ডিং’ খাতে এক বিশাল সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। হালকা ও মাঝারি মানের জাহাজ তৈরিতে বাংলাদেশের সুনাম অনেক আগে থেকেই রয়েছে। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস বা ডেনমার্কসহ ইউরোপের অনেক দেশ এখন গ্রিন শিপিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। সমুদ্রের এই সবুজ বিপ্লবে সফল হতে গেলে বন্দরগুলোর আধুনিকায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরে জাহাজ নোঙর করার সময়টিতে প্রচন্ড বায়ু ও শব্দদূষণ হয়ে থাকে। যদি আমাদের বন্দরগুলোতে “শোর পাওয়ার” বা স্থল বিদ্যুতের আধুনিক ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে সবুজ বিপ্লবের এই পথ অনেক সহজ হবে।

এগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোর দিকে সুদৃষ্টি বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নদীগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার লঞ্চ, কার্গো জাহাজ ও ট্রলার চলাচল করে। এসবের বেশিরভাগই পরিবেশের জন্য উপযুক্ত নয়। পরিবেশবান্ধব এই সবুজ বিপ্লবকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে, অভ্যন্তরীণ নৌপথে ব্যবহৃত ইঞ্জিনগুলোকে ধীরে ধীরে আধুনিক ও হাইব্রিড প্রযুক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। নদীগুলোর নাব্যতা ধরে রাখার জন্য নিয়মিত ড্রেজিং করা জরুরি; যা কম খরচে ও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে বলে মনে করি। 

এদেশের জন্য ‘সবুজ বিপ্লব’ যেমন বিশাল সম্ভাবনার, তেমনি আছে বেশকিছু প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ। বন্দর ব্যবস্থা আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে প্রয়োজন বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ। সম্প্রতি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি খাত এই বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিদেশি বিভিন্ন দেশের সাথে যৌথ উদ্যোগে “স্মার্ট অ্যান্ড গ্রিন লজিস্টিক করিডোর” গড়ে তোলার আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ যদি সরকারি নীতি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের মাধ্যমে দেশীয় শিপইয়ার্ডগুলোকে আরও আধুনিক করতে পারে, তবে এই গ্রিন জাহাজ রপ্তানি করেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করা সম্ভব। পোশাক শিল্পের পাশাপাশি এটি হতে পারে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এজন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘জাতীয় গ্রিন শিপিং নীতিমালা’ প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

‘গ্রিন শিপিং’ এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের টিকে থাকার লড়াই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান। তাই পরিবেশকে বাঁচিয়ে কীভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা যায়, তা আমাদের চেয়ে ভালো আর কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। নীল সমুদ্রের এই সবুজ বিপ্লব আমাদের সামনে এক বিশাল সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। এই জানালাকে কাজে লাগিয়ে আমরা যদি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলে একদিন বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজগুলো পুরো বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে-এই স্বপ্ন অবাস্তব নয়। সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব, উদ্যোক্তাদের সাহসিকতা আর আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে বাংলাদেশ সবুজ নৌ-বাণিজ্যের এক নতুন আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে- এটাই আমার প্রত্যাশা- আমাদের প্রত্যাশা। 

লেখক :

আব্দুল্লাহ খান

শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নীল সমুদ্রে সবুজ বিপ্লব: গ্রিন শিপিংয়ের সম্ভাবনা

মাদারীপুরে পানিতে ডুবে গৃহবধূর মৃত্যু

উত্তর কোরিয়াকে আটকাতে ৫ লাখ ‘ড্রোন যোদ্ধা’ গঠন করবে সিউল

বজ্রপাতের সময় এই সাধারণ ভুলগুলো ডেকে আনতে পারে মৃত্যু!

‘ডিসকাউন্ট না পেলে আরো বাড়ত ধর্ম উপদেষ্টার চিকিৎসা ব্যয়’

পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়ন হলে ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলা উপকৃত হবে : পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী