বগুড়া কৃষি অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ
উত্তরাঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূলে রয়েছে মাটি ও মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন কৃষি। উত্তরবঙ্গের কৃষি ঐতিহ্যগতভাবেই সমৃদ্ধ। বিস্তীর্ণ উর্বর জমি ও বৈচিত্র্যময় আবহাওয়ার কারণে দেশের ‘খাদ্যের ভান্ডার’ বা কৃষির হাব বলা হয়। সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে উত্তরবঙ্গের কৃষি আমাদের টোটাল কৃষিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দারিদ্র্য দূরীকরণে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্তমান কৃষির যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা মোকাবেলা করতে হবে। আগামী পাঁচ বছরে শস্যের নিবিড়তা ৫% বৃদ্ধি, কমিউনিটি ভিত্তিক জৈব সার তৈরি, জৈব বালাইনাশক ব্যবহার, ফল বাগান স্থাপন, ফল সবজি মসলা সংরক্ষণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে রপ্তানিমুখী কৃষি পণ্য সরবরাহ করার লক্ষ্যে বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও জয়পুরহাট জেলা নিয়ে বগুড়া কৃষি অঞ্চলে “বগুড়া কৃষি অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প” নামে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করে এ বছরই (২০২৫-২৬) কার্যক্রম চালু হয়েছে, প্রকল্প ব্যয় ২৫০ কোটি টাকা।
অজানা কারণে দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে বগুড়া পিছিয়ে ছিল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও পর্যবেক্ষকদের অভিমত। তথ্য অনুযায়ী, অতীতে সরকারগুলোর বাজেট ও উন্নয়ন বরাদ্দে বগুড়াকে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়া হতো, যার ফলে প্রাচীন এই জেলায় অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক, কৃষি, শিল্প আর্থসামাজিক প্রসার প্রত্যাশানুযায়ী হয়নি। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সারা দেশে সুষম উন্নয়নের সাথে বগুড়াকেও অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নের স্রোতধারায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছেন।
টেকসই কৃষি উৎপাদনের ধারায় বাণিজ্যিকীকরণ বর্তমান সময়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। রপ্তানিমুখী কৃষির কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য দরকার গুণগত মান নিশ্চিত করে আকর্ষণীয় প্যাকেজিং দিয়ে প্রক্রিয়াজাত মূল্য সংযোজনমূলক কৃষি উৎপাদনকে উৎসাহিত করা। মৌসুমে বাজারে চাহিদার তুলনায় ফলসহ কৃষি পণ্যের জোগান বেশি থাকায় এর একটা বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায় বা পচে যায়। এতে কৃষকদের পাশাপাশি দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের দেশীয় অর্থনীতি। এছাড়া মৌসুমে ফলের সহজপ্রাপ্যতা থাকলেও অফসিজনে দেখা দেয় ব্যাপক ঘাটতি। ফসল সংরক্ষণের জন্য আধুনিক কোল্ড স্টোরেজের অভাব সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিশেষত আলু ও দুধের ক্ষেত্রে এই অভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। কৃষি পণ্যের বাজার মূল্য নির্ধারণে মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রভাব বিস্তার করে। ফলে কৃষকরা তাদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক চাষি এখনও প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা, খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বগুড়ার কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য হুমকি স্বরূপ। সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি অনুশীলনের অদক্ষতাও দায়ী। আলু ও সবজির মানোন্নয়ন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। স্থানীয় কৃষি মার্কেটে মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়াতে কৃষকদের জন্য সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থা করা দরকার। কৃষি উন্নয়নে সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
একই জমিতে একই মৌসুমে বা পর্যায়ক্রমে ধান বা গমের মতো একক ফসলের ওপর নির্ভর না করে, বিভিন্ন ধরনের উচ্চমূল্যের ফসল যেমন- শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, তেলবীজ এবং মসলা জাতীয় ফসল চাষ করে কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও পুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব। বৈচিত্র্যময় ফসল চাষের মাধ্যমে কৃষকদের আয় সাধারণ একক ফসলের তুলনায় ২ থেকে ৩ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব।
গ্রামীণ শ্রমজীবীদের শহরমুখী প্রবণতা এবং কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে কৃষি খাতে ক্রমেই শ্রমিক সংকট তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে বোরো ধান কাটা ও রোপণের মৌসুমে এই সংকট চরম আকার ধারণ করে, যার ফলে কৃষকদের অতিরিক্ত মজুরি গুনতে হয় এবং সময়মতো ফসল ঘরে তোলা ব্যাহত হয় এবং ফসলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। চাষাবাদ পদ্ধতিতে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হলে মানব শ্রমের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পায়। যান্ত্রিকীকরণের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা ফলস্বরূপ উল্লেখযোগ্যভাবে ফসল নিবিড়তা বাড়াতে সাহায্য করে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৭০% ভর্তুকীতে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রকৃত কৃষকদের সরবরাহ করার ব্যবস্থা আছে। পচনশীল বর্জ্যকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পচিয়ে উদ্ভিদের পুষ্টি সমৃদ্ধ জৈব সার বা কম্পোস্ট তৈরি করা যায়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত থাকে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। বাসা-বাড়ির রান্নাঘরের বর্জ্য, শাকসবজির খোসা, ঝরাপাতা এবং খড়কুটো ব্যবহার করে খুব সহজেই বাড়িতেই উন্নত মানের জৈব সার তৈরি সম্ভব। প্রকল্পের আওতায় সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরীর যুগান্তকারী পদক্ষেপ রয়েছে।
আরও পড়ুনবগুড়ায় কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য অপার সম্ভাবনা রয়েছে। মসলা গবেষণা কেন্দ্র এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় জেলার কৃষকরা এখন ড্রাগন ফল, অ্যাসপারাগাস, নিরাপদ সবজি ও উন্নত জাতের মরিচ চাষ করে লাখ টাকা আয় করছেন। কেঁচো সার ও পশুপালনেও অনেকে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের সহযোগিতায় পণ্যের মান বজায় রেখে আন্তর্জাতিক মানের রপ্তানিমুখী কৃষি পণ্য উৎপাদনের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বগুড়ার আলু, সবজি, মরিচ; পাবনার পেঁয়াজ, লিচু; সিরাজগঞ্জের সরিষা-মধু; জয়পুরহাটের আলু, কচুর লতি উৎপাদনে উদ্বৃত্ত, যা যথাযথ সংরক্ষণ ও রপ্তানীর মাধ্যমে এ এলাকার কৃষকদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে যা বগুড়া কৃষি অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা।
লেখক:
ফরিদুর রহমান এম এ
প্রাবন্ধিক ও ডি. কৃষিবিদ
সাধারণ সম্পাদক, ডিকেআইবি, বগুড়া
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








