ভিডিও মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৩ জুন, ২০২৬ ০৪:৪৪ পিএম

হাজির অধিকার ও হজ ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা

হজ শেষে দেশে ফেরার সময় একটি প্রশ্ন বারবার মনে এসেছে আমরা দূর থেকে হজকে যেভাবে দেখি, বাস্তব অভিজ্ঞতা কি সত্যিই ততটাই নিখুঁত? ছোটবেলা থেকে হজ ছিল আমাদের কাছে আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, সাম্য ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য প্রতীক। টেলিভিশনের পর্দায় কাবা শরিফ ঘিরে লাখো মানুষের তাওয়াফ, আরাফাতের ময়দানে অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা কিংবা মিনার তাঁবুতে ইবাদতে মগ্ন মানুষের দৃশ্য দেখে মনে হতো- এ যেন পৃথিবীর বুকে জান্নাতের এক ঝলক। মাঝে মাঝে কিছু অনিয়ম বা ভোগান্তির খবর শোনা গেলেও সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হতো। কিন্তু বাস্তবে, হজ শুধু ইবাদতের নাম নয়; এটি একই সঙ্গে বিশ্বাস, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা, মানবিকতা এবং জবাবদিহিতার এক বিশাল পরীক্ষা।

প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান একই সময়ে একই উদ্দেশ্যে এখানে সমবেত হন। এত বড় আয়োজন পরিচালনা করা নিঃসন্দেহে একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। অবকাঠামো, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে সৌদি আরবের সক্ষমতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে জামারাত, মেট্রো ব্যবস্থা, পরিবহন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গত কয়েক বছরে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। তবুও এই বিশাল ব্যবস্থার ভেতরে এমন কিছু বাস্তবতা রয়েছে, যা নিয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। 

সবচেয়ে বেশি অবাক হতে হয়েছে হজ প্যাকেজগুলোর বাস্তবতা দেখে। “ভিআইপি”, “এ প্লাস”, “প্রিমিয়াম”, “হারামের নিকটবর্তী হোটেল”, “বিশেষ সেবা”—এসব শুধু বিপণনের ভাষা নয়; এগুলো একজন মানুষের বহু বছরের স্বপ্ন, সারা জীবনের সঞ্চয় এবং আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার আকাক্সক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা বছরের পর বছর সঞ্চয় করেন, জমি বিক্রি করেন, অবসরের টাকা খরচ করেন কিংবা পারিবারিক প্রয়োজন পিছিয়ে দিয়ে হজে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তারা যখন কোনো প্যাকেজ কেনেন, তখন আসলে শুধু একটি সেবা কেনেন না; তারা একটি প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখেন। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়ে যায়। মৌখিক আশ্বাস থাকে, কিন্তু লিখিত জবাবদিহিতা দুর্বল। প্যাকেজের ভাষা আকর্ষণীয়, কিন্তু সেবার মান অনিশ্চিত। বিদেশের মাটিতে ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, শারীরিক ক্লান্তি এবং ধর্মীয় আবেগের কারণে অধিকাংশ হাজি অভিযোগ করতেও দ্বিধা বোধ করেন। তারা মনে করেন, “হজে এসেছি, ধৈর্য ধরাই উত্তম।” কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, ধৈর্য কি অব্যবস্থাপনার বিকল্প হতে পারে? হজ অবশ্যই ধৈর্য ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। কিন্তু প্রতিশ্রুত সেবা না পাওয়া, তথ্যের অভাবে হয়রানির শিকার হওয়া কিংবা বয়স্ক হাজিদের অপ্রয়োজনীয় কষ্টকে “হজের কষ্ট” বলে আড়াল করা যায় না। কারণ ইসলাম যেমন ধৈর্যের শিক্ষা দেয়, তেমনি আমানত রক্ষা, প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং মানুষের হক আদায়ের নির্দেশও দেয়।

আজ আমরা মোবাইল ফোনে খাবার অর্ডার করলে তার অবস্থান দেখতে পাই। ব্যাংক লেনদেনের প্রতিটি ধাপ ডিজিটালি অনুসরণ করতে পারি। অথচ কোরবানি বা দম বাবদ প্রদত্ত অর্থের ক্ষেত্রে অনেক হাজি জানেন না তাদের অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হলো, কখন কোরবানি সম্পন্ন হলো বা সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কোথায়? বিশ্বাসের সঙ্গে যখন অর্থ জড়িত থাকে, তখন স্বচ্ছতা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি নৈতিক দায়িত্বও। 

হজের আরেকটি বাস্তবতা মিনাকে ঘিরে। সীমিত জায়গায় লাখো মানুষের অবস্থানের কারণে স্যানিটেশন ও টয়লেট ব্যবস্থার ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি হয়। “ব্যস্ত সময়ে টয়লেট ব্যবহারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, বিশ্রামের সীমিত সুযোগ এবং প্রচন্ড গরমে বয়স্ক হাজিদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।” বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ হাজিদের জন্য এটি বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ। হজের অভিজ্ঞতা কেবল আধ্যাত্মিক নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন ও মর্যাদার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে দেশে ব্যাংক, বিমা, পুঁজিবাজার কিংবা মোবাইল সেবার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে, সেখানে হজযাত্রীদের অধিকার রক্ষার জন্যও আরও শক্তিশালী নজরদারি ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিটি হজ প্যাকেজের জন্য বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ও লিখিত চুক্তি থাকা উচিত, যেখানে হোটেল, দূরত্ব, খাবার, পরিবহন ও অন্যান্য সুবিধা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
দ্বিতীয়ত, হজ শেষে হাজিদের মতামতের ভিত্তিতে এজেন্সিগুলোর রেটিং ও মূল্যায়ন প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে ভালো প্রতিষ্ঠান পুরস্কৃত হবে, আর দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উন্নত করতে বাধ্য হবে। তৃতীয়ত, সৌদি আরবে বাংলাদেশ সরকারের স্থায়ী অভিযোগ ও সহায়তা সেল আরও কার্যকর করা প্রয়োজন, যাতে হাজিরা তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার সমাধান পান। চতুর্থত, কোরবানি ও দমের অর্থ ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে একজন হাজি সহজেই জানতে পারেন তাঁর অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, হজকে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, নাগরিক অধিকার ও সেবার মানের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে। কারণ একজন হাজি শুধু একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান নন; তিনি একজন নাগরিক, একজন ভোক্তা এবং একজন মানুষের মর্যাদার অধিকারী।

হজের পবিত্রতা শুধু কাবার গিলাফে নয়; এটি লুকিয়ে আছে সেই বৃদ্ধ মানুষের চোখের জলে, যিনি সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে এখানে এসেছেন। এটি লুকিয়ে আছে সেই অসুস্থ নারীর প্রার্থনায়, যিনি কষ্ট সহ্য করেও আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। এটি লুকিয়ে আছে সেই সাধারণ মানুষের মর্যাদায়, যিনি বিশ্বাস করেন তিনি আল্লাহর ঘরের মেহমান। কাবার গিলাফ কোটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কিন্তু একজন হাজির অধিকার রক্ষা করাই হয়তো আল্লাহর কাছে আরও বড় দায়িত্ব।

আরও পড়ুন

 

লেখক :

ফারুক আহম্মেদ

প্রাবন্ধিক ও সাবেক ব্যাংকার

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ আ.লীগের ১৪ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

হাজির অধিকার ও হজ ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা

নিষিদ্ধ কোনো দল নিয়ে আলোচনা না করাই শ্রেয়: সেতুমন্ত্রী

৫ দিনের সরকারি সফরে চীন গেলেন ঢাবি উপাচার্য 

মার্কিন সামরিক নির্ভরতা থেকে ইসরায়েলের মুক্ত হওয়া প্রয়োজন : নেতানিয়াহু

নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও, বিআইডব্লিউটিএ’র সেই কর্মকর্তা বরখাস্ত