চিংড়ি শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অঞ্চলে চিংড়ি চাষ এখন একটি বড় শিল্প। দেশের রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে এই খাত থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে ‘বাঙালি গলদা’ ও ‘কালো টাইগার’ চিংড়ির সুনাম দীর্ঘদিনের। রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও এই শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা না হলে উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবিকা উভয়ই ক্ষতির মুখে পড়বে।
প্রথমেই ,ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস ও প্রাকৃতিক নিরাপত্তার ক্ষতি চোখে পড়ার মতো: চিংড়ি ঘের সম্প্রসারণের জন্য ম্যানগ্রোভ বন উজাড় বহু বছর ধরে একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা এবং বাগেরহাট অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি ঘেরের জন্য রূপান্তর হয়েছে। ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের ফলে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত এই বনের সুরক্ষা ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার মতো দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষ আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও কৃষিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়: শুধু বননাশই নয়, চিংড়ি ঘেরে ব্যবহৃত অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি আশপাশের কৃষিজমিতেও প্রভাব ফেলছে। লবণাক্ততার কারণে বহু এলাকায় ধান, শাকসবজি ও ফলচাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষিজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে নিজেদের পেশা পরিবর্তন করছে বা অন্য অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। রাসায়নিক দূষণ ও জলজ পরিবেশ সংকট এর সম্মুখীন হয়: চিংড়ি রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিক নদী ও খাল-বিলের পানিতে মিশে জলজ পরিবেশকে দূষিত করছে। এতে মাছসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। অনেক জলাশয়ে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। জলধারার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়: ঘের তৈরি করতে বাঁধ ও কৃত্রিম খাল-নালা নির্মাণের কারণে নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আবার শুষ্ক মৌসুমে অনেক খালের তলদেশ শুকিয়ে গিয়ে নৌ-চলাচল ও মাছধরা ব্যাহত হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিবর্তনগুলো দীর্ঘমেয়াদে নদীভাঙন এবং উপকূলীয় ভৌগোলিক কাঠামোতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জীববৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে: চিংড়ি শিল্পের সম্প্রসারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ, মাছ ও গাছপালা। মিঠাপানির প্রজাতিগুলো লবণাক্ত পরিবেশে বাঁচতে না পারায় অনেক স্থানেই বিলুপ্তির মুখে পড়ছে। জলজ পোকামাকড় কমে যাওয়ায় মাছের খাদ্যশৃঙ্খলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়: লবণাক্ততা, বন কমে যাওয়া ও পানিদূষণের কারণে অনেক পাখি, মাছ ও গাছপালা ক্ষতির মুখে পড়ছে। কিছু প্রজাতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিয়ন্ত্রিত ঘের ব্যবস্থাপনা, ম্যানগ্রোভ রোপণ, রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ প্রণালির প্রচলন জরুরি। অর্থাৎ, চিংড়ি চাষে নিয়ম- কানুন মানতে হবে। যেখানে বন নষ্ট হয়েছে সেখানে নতুন করে গাছ লাগাতে হবে। রাসায়নিক ব্যবহারে কঠোর নজরদারি দরকার। কৃষক ও স্থানীয় মানুষকে বিকল্প জীবিকার সুযোগ দিতে হবে। পানি চলাচলের পথ বন্ধ করা যাবে না। চিংড়ি শিল্প নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত। তবে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা না করে এ শিল্পের সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।
লেখক :
আরও পড়ুনজান্নাতুল ফেরদাউস অহনা
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








