মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন: কাগজে শক্ত, প্রয়োগে দুর্বল
মানি লন্ডারিং মূলত অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থকে বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া। অপরাধীরা সাধারণত তাদের অবৈধ অর্থকে বিভিন্ন বৈধ ব্যবসা বা কার্যক্রমে ব্যবহার করে অর্থের উৎস আড়াল করে যাতে পরবর্তীতে তারা নিশ্চিন্তে ওই অর্থ ব্যয় করতে পারে। কারণ অবৈধ টাকার উৎস ফাঁস হয়ে গেলে আইনের চোখে তা গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য হবে। আর এই অপরাধের শাস্তির নিশ্চয়তা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রণীত হয় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২। এই আইনে মানি লন্ডারিং এর শাস্তি হলো অন্যূন ৪ বছর এবং অনধিক ১২ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ টাকা বা ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড।
কিন্তু মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হলেও এর কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। সঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ না হওয়া, মামলা করা হলেও তার তদন্তে বছরের পর বছর গড়িমসি করা, সাক্ষ্যপ্রমাণের সঙ্কট ও বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রায় অকার্যকর করে তুলেছে। আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সংস্থাগুলোর দুর্বল সমন্বয়ের কারণে। বাংলাদেশ ব্যাংক, ইঋওট, দুদক, এনবিআর সবাই আলাদা আলাদা কাজ করলেও তাদের মধ্যে সময়োপযোগী তথ্য বিনিময়, যৌথ তদন্ত কিংবা সমন্বিত কৌশল অত্যন্ত দুর্বল। ফলে অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে নিতে পারে অনায়াসে। তাছাড়া বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে এই আইন সম্পর্কে অজ্ঞতাও অকার্যকর হয়ে পড়ার জন্য দায়ী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানি লন্ডারিং কারা করে বা কারা এর সাথে জড়িত? মানি লন্ডারিং একটি ফৌজদারি অপরাধ; কিন্তু এ অপরাধে সাধারণ মানুষ নয় বরং প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই বেশি জড়িত থাকে। যেমন- মাদকদ্রব্য কারবারী ,অসৎ রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রভাবশালী সরকারি আমলা। এদের একটি বড় অংশ অবৈধ টাকাকে বিদেশে পাচার করার সুযোগ পেয়ে যায়, যাতে সাহায্য করে ব্যাংক কর্মকর্তা গণ। ফলে অর্থপাচারের পর আইনগত জবাবদিহিতা খুবই সীমিত হয়ে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি বিশ্লেষণ বলছে, প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। অথচ পাচারের বিপরীতে বাস্তবে সফল বিচার বা উল্লেখযোগ্য দন্ডের সংখ্যা অত্যন্ত কম। আইন অকার্যকর হওয়ায় এবং বিচারহীনতায় অর্থ পাচারকারীরা আরও সাহসী হয়ে উঠছে। মানি লন্ডারিংয়ের অন্যতম ভয়াবহ প্রভাব হলো- এটি সমাজে বৈষম্যকে তীব্রতর করছে। অবৈধ আয়ে প্রভাবশালীরা আরও ধনী হয়ে উঠছে, আর সাধারণ মানুষ ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। অর্থনীতিতেও এর প্রভাব ভয়াবহ। অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে পড়ছে, বিনিয়োগ কমছে,ব্যাংকিং খাত ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। অর্থপাচারের এই ভয়াবহতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যথেষ্ট সচেতনতা না থাকার কারণে অনেকে এখনো মনে করেন এটি শুধুই বড়লোকদের অপরাধ; বাস্তবে এর প্রভাব পড়ছে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ওপর। সচেতনতা কম হলে সামাজিক চাপও তৈরি হয় না ,যা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় এর কার্যকারিতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। তদন্ত, বিচার, সমন্বয় এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছায় ঘাটতি থাকলে কোনো আইনই দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে রক্ষা করতে পারে না। আজ প্রয়োজন আইনকে বাস্তবে কার্যকর করা, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা, এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক রক্ষাকবচ ভেঙে দেওয়া। তবেই অর্থপাচার রোধ হবে, দুর্নীতি কমবে, এবং সমাজে ন্যায়বিচারের ভিত্তি শক্ত হবে।
লেখক :
আরও পড়ুনতাকবির জাহান
শিক্ষার্থী ,আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক

_medium_1773053676.jpg)
_medium_1773053289.jpg)
_medium_1772968366.jpg)




