ঈদ বাজার ও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক চাপ
ঈদ মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে মানুষের মনে তৈরি হয় বিশেষ এক আনন্দ ও উচ্ছ্বাস। সারা বছর কাজের ব্যস্ততার মধ্যে থাকা মানুষও ঈদের সময় একটু স্বস্তি ও আনন্দের খোঁজ পান। নতুন কাপড় পরা, সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এসবই ঈদের আনন্দের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি একটি বাস্তবতাও রয়েছে, যা অনেক সময় খুব বেশি আলোচনায় আসে না। সেটি হলো ঈদ বাজারকে ঘিরে মধ্যবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক চাপ। বিশেষ করে শহর ও শহরতলির মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ঈদের সময় বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়।
বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা সাধারণত শিক্ষিত, কর্মজীবী এবং সীমিত আয়ের মধ্যে জীবনযাপন করে। মাস শেষে তাদের আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে। বাড়িভাড়া, বাজার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল এসব খরচের পর হাতে খুব বেশি অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। ফলে সারা বছরের অন্যান্য সময়ের মতো ঈদের সময়ও তাদের হিসাব করে চলতে হয়। কিন্তু ঈদ এলেই সামাজিক প্রত্যাশা ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সেই হিসাবের বাইরে গিয়ে খরচ করতে হয়।
ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই দেশের বড় বড় মার্কেট, শপিংমল ও বাজারগুলো জমে ওঠে। নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, ব্যাগসহ নানা পণ্যের সমাহারে দোকানগুলো হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। ক্রেতাদের ভিড়ও তখন চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই সময়টাতেই পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। অনেক দোকানে একই পণ্যের দাম বিভিন্নভাবে বলা হয়, দরদাম করেও অনেক সময় কাক্সিক্ষত দামে পাওয়া যায় না। মধ্যবিত্ত ক্রেতারা তখন অনেকটা বাধ্য হয়েই বাজারের এই পরিস্থিতি মেনে নেন।
বিশেষ করে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি হলে খরচের চাপ আরও বেড়ে যায়। বাবা-মা, সন্তান, ভাইবোন সবার জন্য নতুন পোশাক কেনা প্রায় একটি সামাজিক রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ যদি পরিবারের কারও জন্য নতুন কাপড় কিনতে না পারেন, তখন অনেক সময় সেটি নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়। তাই অনেক পরিবার চাইলেও এই সামাজিক প্রত্যাশা এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে সীমিত আয়ের মধ্যেও ঈদের বাজারে তাদের খরচ করতে হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মায়েরা সন্তানদের আনন্দকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। শিশুদের কাছে ঈদ মানেই নতুন জামা, নতুন জুতা, আর আনন্দের দিন। তাই বাবা-মা অনেক সময় নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে গিয়ে সন্তানের জন্য ভালো কিছু কিনতে চান। এমন অনেক পরিবার আছে যেখানে বাবা বা মা নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনেন না, কিন্তু সন্তানের জন্য কেনেন। এই ত্যাগ ও ভালোবাসার মধ্যেই মধ্যবিত্ত জীবনের একটি মানবিক দিক প্রকাশ পায়।
ঈদের সময় শুধু পোশাকের বাজারই নয়, খাদ্যদ্রব্যের বাজারেও চাপ তৈরি হয়। ঈদের দিনে ঘরে ঘরে নানা ধরনের খাবার রান্না করা হয়। সেমাই, পোলাও, মাংস, কোরমা, ফিরনি এসব খাবার ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু এসব খাবারের উপকরণ কিনতে গিয়ে অনেক সময় মানুষকে বাড়তি খরচ করতে হয়। বিশেষ করে ঈদের আগে অনেক খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। তখন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে আবার নতুন করে বাজেট করতে হয়। শুধু বাজারের খরচ নয়, ঈদের সময় যাতায়াত ব্যয়ও একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। শহরে কাজ করা অনেক মানুষ ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। কিন্তু এই সময় বাস, ট্রেন বা লঞ্চের টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ভাড়াও বেড়ে যায়। পরিবার নিয়ে যাতায়াত করলে খরচ আরও বেড়ে যায়। ফলে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ঈদের যাত্রা একটি বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
আধুনিক সময়ের আরেকটি বাস্তবতা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। এখন মানুষ খুব সহজেই অন্যের জীবনযাত্রা দেখতে পারে। কে কোথা থেকে কেনাকাটা করল, কে কত দামি পোশাক পরল এসব বিষয় অনেক সময় অজান্তেই তুলনার মনোভাব তৈরি করে। ফলে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার চেষ্টা করে ঈদের সময় অন্তত কিছুটা ভালোভাবে উদযাপন করতে। কিন্তু এই চেষ্টা কখনো কখনো তাদের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে এসব চাপের মধ্যেও মধ্যবিত্ত মানুষের একটি বিশেষ শক্তি আছে তারা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিতে জানে। ঈদের সকালে নতুন কাপড় পরে নামাজে যাওয়া, পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করা, ছোটদের হাসি-আনন্দ এসব মুহূর্তই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সুখ হয়ে ওঠে। অনেক সময় খুব বেশি খরচ না করেও মানুষ আন্তরিকতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে।
আরও পড়ুনঈদের মূল শিক্ষা হলো সংযম, সহমর্মিতা ও মানবিকতা। তাই এই সময় সমাজের সবারই কিছু দায়িত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ীদের উচিত ঈদের সময় অতিরিক্ত লাভের আশায় পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে না বাড়ানো। একই সঙ্গে বাজার তদারকিতে সরকারের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এতে করে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। ঈদ বাজারকে ঘিরে মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক চাপ আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। তবু এই শ্রেণির মানুষ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আনন্দ ধরে রাখার চেষ্টা করে। তাদের জীবনে হয়তো খুব বেশি বিলাসিতা নেই, কিন্তু আছে পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। সেই ভালোবাসা ও একাত্মতাই শেষ পর্যন্ত ঈদের প্রকৃত আনন্দকে অর্থবহ করে তোলে। যদি সমাজে ন্যায্যতা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভবিষ্যতে ঈদের আনন্দ হয়তো সবার জন্য আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠবে।
লেখক :
আরশী আক্তার সানী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1772968366.jpg)







