ভিডিও শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৮ মার্চ, ২০২৬, ০৪:৫৬ দুপুর

পাহাড়ি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসলীলা রোধ

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ। এদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল জুড়ে রয়েছে বিস্তৃণ পাহাড়ি এলাকা। যা আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছে। চট্টগ্রাম, কক্মবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার সু উচ্চ পবর্তমালা এবং সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোনা জেলার টিলা অঞ্চল জুড়ে এসব পাহাড়ের অবস্থান। যার অধিকাংশই টারসিয়ারি যুগে হিমালয় পর্বত উত্থিত হওয়ার সময় সৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়াও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ভাওয়াল ও মধুপুরের গড় ও উত্তরের বরেন্দ্র অঞ্চলের কিছু জায়গা জুড়ে ঘন অরণ্যের দেখা পাওয়া যায়। 

বন বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট ভূমির ৯.৩৩ শতাংশের অধিক প্রায় ১৩,৭৭,০০০ হেক্টর জায়গা জুড়ে পাহাড়ি বনভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত। এক সময় এসব পাহাড়ই ছিল প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রাণকেন্দ্র। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারার অভয়ারণ্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের মূল কেন্দ্রস্থল। পাহাড়ি অরণ্য, ঝরনা, পশুপাখি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সংস্কৃতির মিলনে গঠে উঠেছে এক অনন্য জীবনব্যবস্থা। এখানে রয়েছে গর্জন, চাপালিশ, তেলসুর, উড়িআম, ঢাকিজাম, সিভিট, সেগুন, গামার, চম্পা, জারুল, বৈলাম সহ অন্যান্য স্থানীয় বিরল প্রজাতির উদ্ভিদের সমাহার। এছাড়া পাহাড়ি বনাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ ও বেত জন্মে। 

হাতি, চিতাবাঘ, বন্যশুকর, হরিণ, বানর, উল্লুক, অজগর, উদয়ী পাকরা ধনেশ, বড় র‌্যাকেট ফিঙ্গে, পাতি-ময়না, গলাফোলা ছাতারে সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাশু-পাখির প্রধান আশ্রয়স্থল হলো পাহাড়। এছাড়া পাহাড়ে বসবাস করে চাকমা, মারমা, গারো, ওরা, বক, রাখাইন, ত্রিপুরা সহ অসংখ্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী।  পাহাড় শুধু প্রকৃতি নয়, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়েরও প্রতীক। আদিবাসীদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, নৃত্য, সংগীত ও ধর্মবিশ্বাসে এই পাহাড়ের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু কালের বিবর্তনে এই জীবনব্যবস্থা ক্রমশই বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। একটি দেশের প্রকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য মোট ভূমির ২৫ শতাংশ  বনভূমি প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী বনভূমির পরিমাণ দেশের মোট ভূমির ১৫.৫৮ শতাংশ। যার ১০.৭৪ শতাংশ বন অধিদপ্তর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত।

যা প্রতিবছর ক্রমানুসারে হ্রাস পাচ্ছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, ভূমিদস্যুদের আগ্রাসন, খনিজ আহরণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে পাহাড়ি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। অপ্রতুল পরিবেশ আইন, দুর্বল প্রশাসনিক নজরদারি এবং অর্থনৈতিক লোভ পাহাড়ি অঞ্চলকে করে তুলেছে ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিবেশবিধ্বংসী।

বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাবার বাগান, তামাক চাষ ও বিদেশি বিনিয়োগের নামে পাহাড়ি জমি দখলের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এছাড়া পাহাড়ে পর্যটন ব্যবসা লাভজনক হয়ে উঠায় প্রতিনিয়ত পাহাড় ও বনভূমি কেটে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত রিসোর্ট ও পর্যটন কেন্দ্র। এতে ভূমিহীন হচ্ছে পাহাড়ে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষরা। একদিকে যেমন বনভূমি কমছে, অন্যদিকে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হারাচ্ছে। এসব পর্যটকরা প্রায়শই প্রকৃতির প্রতি উদাসীন।নিজেদের ব্যবহৃত উচ্ছিষ্ট যেখানে সেখানে ফেলে রাখে।  যা পাহাড়ি পরিবেশকে দূষিত করে তোলে। পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষ খুব জনপ্রিয়। ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড় কেটে জুম চাষ ও বসত বাড়ি নির্মাণের ফলে প্রতিবছর বর্ষায় পাহাড় ধসের ঘটনাও বেড়ে চলেছে। এছাড়া খনিজ আহরণ, শিল্পকারখানা স্থাপন, বনভূমি উজাড়, বন্য প্রাণী হত্যা ও চোরাচালান ইত্যাদির ফলে পাহাড়ি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের ধারপ্রান্তে।

আরও পড়ুন

এই অবস্থা থেকে উত্তরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে অবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে পাহাড় সংরক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন ও যথাযর্থ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বৃক্ষ নিধন, পাহাড় কাটা, বনভূমি ধ্বংস, জমি দখল ও ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বন্যপ্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে কার্যকরী আইন প্রণয়ন ও যথাযর্থ বাস্তবায়ন করতে হবে। নিয়মিত প্রশাসনিক মনিটরিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়ি পর্যটন শিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে রির্সোট ও পর্যটন ব্যবসাকে পরিবেশমুখী করে তুলতে হবে। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা বেঁধে দিতে হবে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পাহাড়ি সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা করতে হবে। পাহাড়কে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মুনাফার উৎস হিসেবে বিবেচনা না করে, আমাদের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের অংশ সে দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সরকারী - বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনগণ, পর্যটন কর্তৃপক্ষ এবং পর্যটক সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আসুন পাহাড়ি পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে নিজ নিজ জায়গা থেকে সকলে এগিয়ে আসি। 

লেখকঃ

সবুজ আহমেদ জীবন

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাত দিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন বিরোধী দলীয় নেতা

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজগুলোও মার্কিন ঘাঁটির মতোই ছাই হবে: আইআরজিসি

উচ্চতর প্রশিক্ষণে পাকিস্তান যাচ্ছেন ১২ সরকারি কর্মকর্তা

জিয়াউর রহমান সবাইকে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন: রাষ্ট্রপতি

বরযাত্রী বেশি আসায় বিয়ে বাড়িতে সংঘর্ষ, আহত ৫

শান্তিরক্ষা মিশনের মেয়াদ বাড়াল জাতিসংঘ