ভিডিও শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৫:০৫ বিকাল

জনসংখ্যা বাড়ছে ঠিকই কিন্তু মানুষ বাড়ছে না

“হে মুগ্ধ জননী, সাত কোটি সন্তানেরে রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।”- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এই দুই চরণ কেবল আক্ষেপ নয়, এ যেন একটি জাতির বিবেকের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগপত্র। প্রায় একশ বছর পর দাঁড়িয়েও মনে হয়, এই অভিযোগের মেয়াদ আজও ফুরোয়নি। এই সংখ্যা এখন সাত কোটির চেয়ে অনেক বেশি। আমরা সংখ্যায় বাড়লেও, আমাদের মধ্যকার মনুষ্যত্ববোধ যেন দিনে দিনে লোপ পাচ্ছে। সংখ্যা আমাদের পরিচয় হতে পারে, কিন্তু মানুষ হয়ে ওঠা আমাদের দায়িত্ব। এই দায়িত্বহীন জাতি দ্বারা কী আদৌ আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হতে পারবে নাকি এই দেশ একদিন সংখ্যার ভারেই ভেঙে পড়বে? আমরা ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে।

বিগত বছরগুলোর মতো এই বছরেও বাংলাদেশ সাক্ষী হয়েছে এমন কিছু অপরাধের যা একটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কেবল দুর্ভাগ্যের নয়, লজ্জারও বটে। ধর্ষণ, লুটপাট, চাঁদাবাজি, হত্যা– কী নেই এই বছরের প্রতিটি পাতায়? চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই ২৯৪ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৬ জন, যার মধ্যে ৪৪ জনই শিশু। এই সংখ্যাগুলোর পেছনে যে ভয়াবহ বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ হলো শিশু আছিয়ার ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনা। আমাদের সমাজ আজ এতোটাই কলুষিত যে, আট বছরের একটি শিশুকেও আমরা নিরাপত্তা দিতে পারিনি। আছিয়াকে নির্যাতন করা হয়েছে এমন এক পরিবেশে যেখানে তার সবচেয়ে বেশি নিরাপদে থাকার কথা ছিল। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা কেবল একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেয়নি, বরং এটি আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর ব্যর্থতাকে উন্মোচন করেছে। আছিয়ার মতো প্রতি ঘরে ঘরে এমন অনেক নারী ও শিশু রয়েছে যারা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয় কিন্তু ভয়, লজ্জা আর সামাজিক চাপের কারণে তাদের কণ্ঠস্বর কখনোই আমাদের কানে পৌঁছায় না।

এই বছরে আতঙ্কের আরেক নাম ছিল চাঁদাবাজি। আধুনিক যুগে অন্য সবকিছুর মতো চাঁদা চাওয়ার ধরনও বদলে গেছে। এখন আর গোপনে নয়, বরং প্রকাশ্যেই ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চাঁদাবাজির জের ধরে ঢাকার মিডফোর্ড হাসপাতালের সামনে এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। হাসপাতালের গেইট সংলগ্ন ব্যস্ত সড়কে সোহাগ নামক এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা না পেয়ে তাকে পাথর দিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তারা এতোটাই নৃশংস ছিল যে, সিসিটিভি ফুটেজে তাদেরকে নিহত ব্যক্তির নিথর দেহের উপর উল্লাসে ফেটে পড়তে দেখা যায়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, চাঁদাবাজি এখন আর শুধু অর্থ আদায়ের অপরাধ নয়- –এটি প্রকাশ্য নৃশংসতা ও মানবিকতার সম্পূর্ণ ভাঙনের প্রতিচ্ছবি। যেই সমাজে আতংকই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে মানুষ হওয়াটাই যেন সবচেয়ে বড় অপরাধ।

২০২৫ শেষ হতে হতে আমরা আরও কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনার সম্মুখীন হই। কিছুদিন আগে মোহাম্মদপুরে ঘটে যাওয়া মা ও মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সকল অমানবিকতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। এই ঘটনার সাথে বাড়ির গৃহকর্মী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল এবং সে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে নিহতের স্কুল ড্রেস পরে বাসা থেকে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় একটি মোবাইল, একটি ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যান আসামি। যদিও পরবর্তীতে পুলিশ সফলভাবে সেই গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তবু এই গ্রেপ্তারকার্য কোনো স্বস্তির সমাপ্তি নয়; কারণ এ হত্যাকান্ড আমাদের ঘরের ভেতরের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের ধারণাকেই ভেঙে দিয়েছে। এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের আরেকটি নির্মম প্রমাণ। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয় অপরাধ এখন দূরের কিছু নয়, এগুলো আমাদের কাছেই নিরবে বেড়ে উঠছে।

এই বছরের শেষপ্রান্তে এসে আমরা হারাই এক ইতিহাসগড়া ব্যক্তিত্বকে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই গণঅভুত্থানের সম্মুখ সারির যোদ্ধা শহিদ শরীফ ওসমান বিন হাদি। কোনো রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকান্ডের ফলে আমরা কেবল অসামান্য নেতাকেই হারায়নি; এই ঘটনা প্রমাণ করে দেয় এই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কতোটা অস্থিতিশীল। তার উপর ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৌহিদি জনতার নাম করে এক শ্রেণির মানুষ প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মতো কিছু সংবাদ অফিস ভাঙচুর করে এবং কোনো কারণ ছাড়াও দেশের সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছায়ানটে হামলা চালায়। এই সহিংসতা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, এদেশে সত্য, সংস্কৃতি সবকিছুই যেন দিনে দিনে লোপ পাচ্ছে। এই প্রশ্নগুলো আমাদের কেবল বিচলিত করার জন্য নয়, বরং আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্য। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে না পারে, সমাজ যদি দুর্বলকে রক্ষা করতে না জানে, আর আমরা যদি একেকটি অন্যায়ের পর শোক আর ক্ষোভে থেমে যাই তবে এই সহিংসতার চক্র ভাংবে কিভাবে ?

আরও পড়ুন

এই ১৮ কোটি মানুষের দেশে এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনা করার। আমরা কোন সমাজ গড়ে তুলছি এবং কোন মূল্যবোধ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রতিষ্ঠা করছি। মনুষ্যত্ব ছাড়া কখনো একটি রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। সংখ্যায় ভরা এই দেশে যদি মানুষ না থাকে, তবে রাষ্ট্র থাকবে কিসের উপর দাঁড়িয়ে–- এই প্রশ্নই আমাদের সবচেয়ে বড় উত্তরহীনতা। 

লেখক

অদ্রিতা দাস

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জনসংখ্যা বাড়ছে ঠিকই কিন্তু মানুষ বাড়ছে না

শীতে উষ্ণতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে

মেসির সঙ্গে বৈঠক, বিশ্বকাপ স্কোয়াড নিয়ে যা বললেন স্কালোনি

শিগগিরই আমরা মেক্সিকোতে স্থল অভিযান শুরু করতে যাচ্ছি : ট্রাম্প

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আইসিসি নেবে : বিসিসিআই সেক্রেটারি

ভক্তদের আচরণে বিড়ম্বনার মুখে অমিতাভ বচ্চন