ভিডিও বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারী, ২০২৬, ১১:২০ দুপুর

নিরাপদ শিশু খাদ্য চাই

একটি শিশুর জন্ম কেবল একটি পরিবারে নয়, গোটা জাতির হৃদয়ে আনন্দের সঞ্চার ঘটায়। শিশুর হাসি, শিশুর কণ্ঠ, শিশুর প্রাণচাঞ্চল্যে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা। কিন্তু সেই শিশুই যখন জন্মের পর থেকেই অনিরাপদ খাদ্য, বিষমিশ্রিত দুধ বা ভেজাল পুষ্টির শিকার হয়, তখন এই আনন্দ এক ভয়াবহ উদ্বেগে রূপ নেয়। আজকের পৃথিবীতে শিশুদের খাদ্য নিয়ে যে সংকট, তা কেবল দরিদ্র দেশের নয়, ধনী রাষ্ট্রেও রয়েছেÑকিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে তা এখন এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট। “নিরাপদ শিশু খাদ্য চাই”Ñএই দাবি এখন সময়ের সবচেয়ে মানবিক ও জরুরি উচ্চারণ। কারণ, একটি শিশুর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা মানে শুধু তার পুষ্টি নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন। আমরা প্রায়ই বলি, শিশু হচ্ছে জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেই ভবিষ্যৎকে কতটা নিরাপদ রাখছি? বাংলাদেশের বাজার ঘুরে দেখলে বোঝা যায়, শিশুর খাবারের নামে এক অন্ধকার বাণিজ্যজগত তৈরি হয়েছে। দুধ, সিরিয়াল, চকলেট, জুস, স্ন্যাকস, এমনকি শিশুদের জন্য নির্ধারিত স্যুপ-সবখানেই চলছে অনিয়ম, ভেজাল ও প্রতারণা। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য নতুন প্যাকেটে বিক্রি হচ্ছে, রাসায়নিক সংরক্ষণকারীর মাত্রা অতিক্রম করছে আন্তর্জাতিক মান, আর শিশুরা সেইসব পণ্য খেয়ে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের পরিপাকতন্ত্র দুর্বল হয়ে যায়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে এবং এক সময় নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এই দৃশ্যের মধ্যে আমরা একটিও ভাবি নাÑএকটি শিশুর শরীরে প্রবেশ করা এই বিষই একদিন পুরো জাতির রক্তে ছড়িয়ে পড়বে। 

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন রয়েছে, আছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতা, জনবল সংকট, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতিÑসব মিলিয়ে শিশু খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সুপারশপে এখনো এমন অনেক ব্র্যান্ড বিক্রি হচ্ছে যেগুলোর কোনো মান নিয়ন্ত্রণ সনদ নেই। গ্রামীণ বাজারের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। নাম না জানা চীনা বা ভারতীয় ব্র্যান্ডের শিশু খাদ্য, আমদানিকারকের নাম ছাড়াই, এমনকি স্থানীয়ভাবে তৈরি অজানা পাউডারও “বেবি মিল্ক” নামে বিক্রি হচ্ছে। কেউ জানতে চায় না এগুলো কোথায় তৈরি, কীভাবে সংরক্ষিত, আর কোন উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় শিশুর খাদ্য নিরাপত্তা এখন একটি নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। একটি শিশুর খাদ্য যতটা বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়, ততটাই মানবিক দায়িত্বের ক্ষেত্র। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ এ বলা হয়েছে, প্রতিটি শিশুর পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই অধিকার এখনো কাগজে সীমাবদ্ধ। শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে কার্যকর কোনো জাতীয় নীতি বা বার্ষিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশে এখন প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে প্রায় ৮ হাজার শিশু। এদের অর্ধেকের বেশি জন্মের প্রথম এক বছরেই নানা পুষ্টিহীনতা, অ্যালার্জি বা হজমজনিত সমস্যায় ভোগে। এর বড় অংশই অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফল। শিশুদের জন্য নির্ধারিত পুষ্টির ঘাটতি এখন এক প্রকার জাতীয় সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার  মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু স্টান্টিংয়ে ভুগছে, অর্থাৎ বয়স অনুযায়ী তাদের বৃদ্ধি থেমে গেছে। এটি কেবল দারিদ্র্যের কারণে নয়, বরং খাদ্যের মান ও নিরাপত্তাহীনতার ফলাফল। এই প্রেক্ষাপটে সরকার যদি সত্যিই “স্মার্ট বাংলাদেশ” বা “সুস্থ বাংলাদেশ” গড়তে চায়, তবে প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে শিশু খাদ্য নিরাপত্তায় বিপ্লব ঘটানো। শিশু খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও সংরক্ষণের ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রক নীতি প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি ব্র্যান্ডের উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়মিত পরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। শিশু খাদ্যকে সাধারণ ভোক্তা পণ্যের বদলে “জরুরি স্বাস্থ্যপণ্য” হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে, যাতে এটি বিশেষ সুরক্ষা ও নজরদারির আওতায় আসে।

এছাড়া জনসচেতনতা তৈরি করাও জরুরি। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, শিশুর স্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনো আপস করা যায় না। শিশুর খাবারে যতটা সম্ভব ঘরোয়া ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করতে হবে। বাজারের প্রক্রিয়াজাত খাবারের চেয়ে মায়ের হাতে রান্না করা এক বাটি খিচুড়ি বা দুধ-ভাত অনেক বেশি নিরাপদ ও পুষ্টিকর। বিশেষ করে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধই শিশুর জন্য যথেষ্টÑএই বিষয়টি সবাইকে জানতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে এখনো অনেক মা ভুল ধারণায় ভোগেন যে, শিশুর দ্রুত বৃদ্ধি ঘটাতে হলে ফর্মুলা দুধ প্রয়োজন। এই অজ্ঞতার সুযোগ নেয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যারা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে “মাতৃত্বের বিকল্প” বানিয়ে তুলছে নিজেদের পণ্য। এখানে গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব বিশাল।

শিশু খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সচেতনতা ক্যাম্পেইন এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাÑসবকিছুতেই সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন “সকালের বাণী” বা অনুরূপ সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ পত্রিকাগুলো নিয়মিতভাবে শিশুস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক কলাম প্রকাশ করলে তা জনমত তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলোকেও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ভাবতে হবে। তারা চাইলে মাননিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখতে পারে, ল্যাব পরীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারে, এমনকি ভোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখার উদ্যোগ নিতে পারে। বিশ্বে অনেক দেশেই এখন “Baby Food Transparency Initiative ” চলছে - যেখানে প্রতিটি পণ্যের উপাদান, পরীক্ষা ও উৎপাদন তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিশু খাদ্য সচেতনতা শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবারে সচেতনতা পৌঁছানো সম্ভব। যেমন-“নিরাপদ খাবার খাই, শিশুকে সুস্থ রাখি”Ñএই বার্তাটি যদি প্রতিটি শিশুর কণ্ঠে ওঠে, তবে তা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলবে। আরও একটি দিক অনেকে এড়িয়ে যান, তা হলো অনলাইন বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে শিশু খাদ্য বিক্রির ঝুঁকি। শিশুর নিরাপত্তা মানে কেবল দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা নয়; এটি তার প্রথম চুমুক, প্রথম আহার, প্রথম পুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি শিশুর শরীরে যে খাদ্য প্রবেশ করে, তার প্রতিটি কণা যেন জীবনের উৎস হয়, মৃত্যুর নয়Ñএই নিশ্চয়তাই আমাদের দিতে হবে। শিশুর নিরাপদ খাদ্য মানে নিরাপদ জাতি, নিরাপদ ভবিষ্যৎ, নিরাপদ মানবতা। আমরা যদি সত্যিই আমাদের সন্তানদের ভালোবাসি, তবে আজই আমাদের এক কণ্ঠে বলতে হবেÑনিরাপদ শিশু খাদ্য চাই, এখনই চাই। কারণ, শিশুর জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো সুযোগ নেই। একটি শিশুর কান্না শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের আর্তনাদ। তাই আজ আমাদের দায়িত্ব একটাই-প্রতিটি শিশুর হাতে তুলে দিতে হবে বিশুদ্ধ, নিরাপদ, ভালোবাসায় ভরা খাদ্য, যেন সে হাসতে পারে নির্ভয়ে, বড় হতে পারে সুস্থভাবে, আর আমাদের আগামী প্রজন্ম হয়ে ওঠে সত্যিকারের মানবিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন

লেখক

মোছাঃ শাকিলা খাতুন

প্রাবন্ধিক তেকানীচুকাইনগর,  
সোনাতলা,  বগুড়া।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফেব্রুয়ারিতেই বাজারে আসতে পারে অ্যাপলের নতুন আইফোন

জাতীয় শহীদ সেনা দিবস আজ

চট্টগ্রামে গ্যাস বিস্ফোরণে নিহত বেড়ে ৫

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সার্বভৌমত্ববিরোধী তৎপরতা ছিল: প্রধানমন্ত্রী

সৌদি আরব দিয়ে বিদেশ সফর শুরু করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি