অসচেতনতা থেকেই জন্ম ডিজিটাল দূষণ
সাধারণত আমরা “দূষণ” শব্দটি শুনলেই প্রাকৃতিক দূষণের কথা মনে করি এবং দূষণ বলতে বুঝে থাকি পরিবেশের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের যে অবাঞ্ছিত পরিবর্তন, যা জীবের জীবনধারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তাকেই দূষণ বলে। অর্থাৎ বলতে পারি, যখন স্বাভাবিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, তখনই তাকে পরিবেশদূষণ বলা হয়। যেমন বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মাটিদূষণ এবং শব্দদূষণ ইত্যাদি। এগুলোর ফলে সরাসরি প্রাকৃতিক ভারসাম্য ব্যাহত হয় এবং মানুষের জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়ে যায়। অন্যদিকে প্রযুক্তির অতিরিক্ত-ব্যবহারও এক ধরনের নতুন দূষণ সৃষ্টি করে, যাকে আমরা “ডিজিটাল দূষণ” বলে থাকি। মোবাইল, কম্পিউটার, ডেটা সেন্টারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের উৎপাদন ও ব্যবহার পরিবেশে এক বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এসব যন্ত্র তৈরির জন্য যেমন দরকার নানা ধরনের উপাদান আবার এসব সংরক্ষণ করতে গিয়েও মাটি ও প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট করতে হয়। অন্যদিকে, অকার্যকর বা পরিত্যক্ত ডিভাইসের বর্জ্যও পরিবেশে জমে গিয়ে এক বিশেষ ধরনের বর্জনের সৃষ্টি করে। যাকে ই-বর্জ বলতে পারি।
কিন্তু দূষণ কেবল এই প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ডিজিটাল দূষণেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এর ব্যবহার এতোটা বেড়েছে যে, এটি এখন মানুষের জীবনের একটু অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তথ্য বিনিময় থেকে শুরু করে মতামত প্রকাশ, বিনোদন এবং শিক্ষা সবই এখন ফেসবুক, টুইটার (এক্স), ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি এক নতুন ধরনের সামাজিক অবক্ষয়েরও জন্ম হয়েছে, যাকে বলতে পারি সোশ্যাল মিডিয়া পলিউশন বা ডিজিটাল সামাজিক দূষণ এবং আমরা বলতে পারি, আজকের সমাজে সবচেয়ে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হলো এই ডিজিটাল সামাজিক দূষণ। এটি প্রযুক্তি বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করেই সমাজ ও মানুষের মানসিক পরিবেশকে দূষিত করে থাকে। এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে ভুয়া খবর, গুজব, ঘৃণামূলক বক্তব্য, সাইবার বুলিং সহ অশ্লীল কনটেন্ট ছড়িয়ে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। খুব অল্প সময়ে একটি মিথ্যা খবর হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, ধর্মীয় উসকানি বা বিদ্বেষ ছড়ানো, যা সমাজে বিভক্তি ও শত্রুতা বাড়িয়ে দেয়। মানুষের মাঝে একে ওপরের প্রতি আস্থা নষ্ট করে এবং সামাজিক সম্প্রীতি ভেঙে দেয়।
পরিবেশ দূষণ, ডিজিটাল দূষণ এবং ডিজিটাল সামাজিক দূষণের মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে। এই সবকটিই মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রাকৃতিক দূষণ যেমন বায়ু, পানি ও মাটিকে নষ্ট করে আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে, তেমনি ডিজিটাল দূষণও বাহ্যিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে, ডিজিটাল সামাজিক দূষণ মূলত মানুষের মানসিক ও সামাজিক পরিবেশের উপর ব্যাপকভাবে আঘাত করে। মানুষের চিন্তাভাবনা, আচার-আচরণ ও সম্পর্কের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
ফলে দেখা যায়, প্রাকৃতিক দূষণ আমাদের বসবাসযোগ্য ভৌত পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলে এবং ডিজিটাল দূষণ প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের মাধ্যমে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে, আর অন্যদিকে ডিজিটাল সামাজিক দূষণ মানবসমাজের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই তিন ধরনের দূষণ আলাদা মনে হলেও আসলে তারা একে অপরের সাথে সংযুক্ত। সবশেষে তাদের প্রভাব মানুষের টেকসই জীবনযাপন ও পৃথিবীর ভারসাম্যের ওপরই গিয়েই পড়ে। সুতরাং, আমাদের উচিত শুধু প্রকৃতিকে নয়, মানব সমাজ ও মানসিক পরিবেশকেও দূষণমুক্ত রাখা। সচেতনতার সাথে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার, তথ্য যাচাই, অপ্রয়োজনীয় কনটেন্টে সময় ব্যয় কমানো, এসব অভ্যাস ডিজিটাল সামাজিক দূষণ কমাতে সাহায্য করবে। প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করা নয়, বরং দায়িত্বশীল ও নৈতিক ব্যবহারই আমাদের এই ডিজিটাল সামাজিক দূষণ থেকে রক্ষা করতে পারবে।
আরও পড়ুন
মো: সাইদুর রহমান
শিক্ষার্থী
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








_medium_1771831074.jpg)