নদীকেন্দ্রিক পর্যটনে রয়েছে অপার সম্ভাবনা
নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে জালের মতো প্রায় সাড়ে সাতশো নদ-নদী ছড়িয়ে থাকলেও সেগুলো নিজেরাই যেন আজ অনেকটা মাতৃহারা। বেশিরভাগই জীর্ণ, শীর্ণ, ময়লা আবর্জনায় ভর্তি। এ ধরনের নদী ভ্রমণের জন্য আকর্ষণীয় তো নয়ই, ধারে কাছে যাওয়ার মতোও নয়। অথচ এই নদীগুলোতেই একসময় পালতোলা নৌকার শোভাযাত্রা দেখা যেত। সময়ের বিবর্তনে সে স্থান দখল করেছে ভটভট শব্দ করা ইঞ্জিনচালিত নৌকা। অথচ বৈঠা চালিত নৌকার শব্দহীন ভ্রমণে নদীর দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রকৃতির সাথে নিজেদের একাত্ম করে তুলতে পারতো মানুষ। সেই নৈঃশব্দের নৌকাভ্রমণের সুযোগ তো গেছেই, আনন্দময় নৌভ্রমণই এখন অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে নদীগুলোর করুণ দশার কারণে। নদীগুলোর দুই পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে উঠেছে গাদা গাদা পলিথিন ও প্লাস্টিকে। শিল্পকারখানার বর্জ্য ফেলার ড্রেনও সংযুক্ত রয়েছে নদীগুলোর সাথে। ফলে নদীগুলোর দুর্গন্ধ থেকে দূরে থাকছে নৌভ্রমণ পিয়াসী মানুষ। একজন পর্যটক যখন নৌ ভ্রমণে যাবেন,তখন তিনি নিশ্চয়ই আবর্জনার পচা গন্ধ নিতে যাবেন না। নদীর দু’পাশের কংক্রিটের অবৈধ ¯া’পনা, হাটবাজার, ঝোপজঙ্গল, বালু কাটার গর্ত, নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। পর্যটকরা নদীর বুকে ভেসে দেখতে চান দু’পাশের অবারিত সবুজ প্রকৃতি। নৌপথে দুর্ঘটনার আতঙ্কও কি কম? ফিটনেসবিহীন লঞ্চ, ট্রলারের বেপরোয়া গতি পর্যটকদের মনে ভীতির সঞ্চার করে। নদীভ্রমণশেষে নামার জন্য যে সুন্দর জেটি বা পরিচ্ছন্ন ঘাট প্রয়োজন, তাও নেই বললেই চলে। শীতকালেই এদেশে পর্যটনের উপযুক্ত সময়। অথচ সেই শুকনো মৌসুমে নাব্যতা কম থাকায় কোন বড় লঞ্চ বা পর্যটকবাহী জাহাজের নদীগুলোতে আসা সম্ভব হয় না। এতসব নেতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও মৃতপ্রায় নদীগুলোতে প্রাণ সঞ্চার করা অসম্ভবও কিছু নয়। দরকার শুধু সরকারের সদিচ্ছা, সমন্বিত, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। সবার আগে দরকার নদীগুলোকে স্বচ্ছ পানিসমেত জাগিয়ে তোলা। একইসাথে দরকার কঠোরভাবে নদীগুলোকে দখল মুক্ত করা, দুষণ দূর করা, শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করা, ড্রেজিং করা, নদীর উভয় তীরে সৌন্দর্যবর্ধনসহ পানির স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা। এসব কাজ নিয়মিত তদারকির জন্য প্রয়োজন একটি উচ্চ পর্যায়ের মনিটরিং কর্তৃপক্ষেরও।
নদীর দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য উপভোগের আকর্ষণকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বে গড়ে উঠেছে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প, যা উন্নত দেশগুলোর জাতীয় আয়ের এক অন্যতম প্রধান খাত। এই খাতের অর্থ আসে ভালো মানের লঞ্চ বা জাহাজ, ক্রুজশিপ, সৈকতসংলগ্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় আবাসন ও মানসম্মত খাবার গ্রহণ, ছোট ছোট নৌকা ও স্পিডবোটে করে বেড়ানোর ভাড়া ও রাজস্ব থেকে। শুধু নৌকায় বসে নদী দেখাই পর্যটন নয়। আধুৃনিক পর্যটনে নদীর সাথে যুক্ত থাকে ওয়াটার স্কিং, ফ্লোটিং মার্কেট, ভাসমান রেস্তোরাঁ,উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইত্যাদি। এদেশের নদীঅঞ্চলে এসব নেই বটে কিন্তু নদীগুলোকে বাঁচানোর প্রয়োজনে আধুনিক পর্যটনের আদলে নদীকেন্দ্রিক শিল্প গড়ে তোলার কোন বিকল্পও নেই। প্রকৃতিপ্রেমিক প্রতিটি মানুষ নদীর সৌন্দর্যে অভিভূত হয়। যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগে রিভার ট্যুরিজম দেশি বিদেশি পর্যটকদের প্রশান্তির ছোঁয়া দিতে পারে। সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ এসব জেলা নিয়ে যে বিশাল হাওড় অঞ্চল বিস্তৃত, তাতে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ছে। উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালীতেও নৌ পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পর্যটন শিল্প। লন্ডনের টেমস, ইতালির ভেনিস, মিশরের নীলনদ এসব নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের অনন্য উদাহরণ। আমাদের দেশের সবদিকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদী ও নদীকেন্দ্রিক জনপদেও রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। সারা বিশ্বই এখন নদীকেন্দ্রিক ইকো ট্যুরিজমকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকেও। রাজধানী ঢাকাকে চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছে চারটি নদী। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী। এই নদীগুলোও আজ প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব, শিল্পবর্জ্য ও আবর্জনার কারণে সংকুচিত, দুর্গন্ধযুক্ত ও জীর্ণ। অথচ এই চার নদীই হতে পারে ঢাকাবাসীর বিনোদনের প্রধান কেন্দ্রস্থল। আমরা লাভজনক পর্যটন শিল্প গড়ার কাজটি শুরু করতে পারি রাজধানীর এই চারটি নদী দিয়েই। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। আশার কথা হলো-সরক্রা ইতোমধ্যে নৌ পর্যটন গড়ে তোলার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে নাফ ট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার ঘোষণা পর্যটন বিকাশে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। চাঁদপুরের মেঘনার চরে গড়ে তোলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন-শুধু কক্সবাজার, কাপ্তাই, চাঁদপুর মোহনা, হাওড় অঞ্চল নয়, সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে রিভার ট্যুরিজম তথা নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের বিকাশ ঘটানো হলে সমগ্র বাংাদেশই হয়ে উঠতে পারে দেশি বিদেশি ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের তীর্থস্থান। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাছের প্রজনন বৃদ্ধির সাথে নদীগুলোতে পালতোলা নৌকার সারিরও দেখা মিলবে আবার। এভাবে নৌপর্যটনের বিভিন্নমুখী খাত থেকে আসা বিপৃুল পরিমাণ অর্থ দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলতে পারে নিঃসন্দেহে। স্মরণযোগ্য যে-নদীকেন্দ্রিক পর্যটন কেবল বিনোদন নয়, এটি মৃতপ্রায় নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার একটি কার্যকর ও সমন্বিত উপায়ও বটে। কারণ নদী থেকে যখন বিভিন্নভাবে আয় আসতে থাকবে, তখন নদীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দখলমুক্ত ও বিনোদনবান্ধব রাখার দায়বদ্ধতা অনুভূত হবে সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যেই।
লেখকঃ
আরও পড়ুনরাহমান ওয়াহিদ
কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








