বেকারত্বের দহন ও সম্ভাবনার নবদিগন্ত
একবিংশ শতাব্দীর এই প্রচন্ড প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে তারুণ্য মানেই এক অবিনাশী প্রাণশক্তি, যা দেশ ও জাতির মেরুদন্ড হিসেবে স্বীকৃত। তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার ললাটে যখন বেকারত্বের অভিশাপ তিলক এঁকে দেয়, তখন সেই প্রাণশক্তি হয়ে ওঠে এক বিষাদময় বোঝা। বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত বেকারত্ব কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি জাতির স্বপ্নভঙ্গের মহাকাব্য। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আঙিনা পেরিয়ে হাজারো মেধাবী তরুণ যখন একরাশ রঙিন স্বপ্ন নিয়ে কর্মজীবনের রণাঙ্গনে পা রাখে, তখন রূঢ় বাস্তবতা তাদের অভ্যর্থনা জানায় শূন্যতা দিয়ে। আমাদের সনাতনী শিক্ষাব্যবস্থার সাথে আধুনিক শ্রমবাজারের যোজন যোজন দূরত্ব, কারিগরি দক্ষতার অভাব এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এই সংকটকে এক ভয়াবহ রূপ দান করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর প্রত্যাশার চাপে পিষ্ট হয়ে তরুণেরা যখন বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন তাদের অন্তরে জন্ম নেয় এক গভীর হীনম্মন্যতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
বেকারত্বের এই করাল গ্রাস কেবল অভাব নয়, বরং এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের নীল নকশা তৈরি করে। যখন একজন শিক্ষিত যুবক সমাজ ও পরিবারের অবজ্ঞা আর বক্রোক্তির সম্মুখীন হয়, তখন তার ভেতরের আত্মবিশ্বাস তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এই অন্তহীন হতাশা থেকে মুক্তির নেশায় অনেকে বেছে নেয় বিপথগামিতার অন্ধকার গলি। মাদকাসক্তির করাল গ্রাস থেকে শুরু করে ছিনতাই, চাঁদাবাজি কিংবা সাইবার অপরাধের মতো অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়া যেন এক অবধারিত নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়টি রচিত হয় তখন, যখন জীবনের সমস্ত আলো নিভে যায় এবং বিফলতার গ্লানি সইতে না পেরে কোনো এক সম্ভাবনাময় প্রাণ আত্মহননের মতো চরম ও আত্মঘাতী পথ বেছে নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিসিএস বা সম্মানজনক চাকরির পেছনে বছরের পর বছর হন্যে হয়ে ছুটে ব্যর্থ হওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মিছিল আমাদের সমাজ ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।
বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে এমন অসংখ্য বিয়োগান্তক ঘটনা আমাদের সমাজকে বিদ্ধ করে। কিছুদিন আগে খবরের কাগজে আসা সেই যুবকের কথা ভাবলে আজও শিউরে উঠতে হয়, যিনি দীর্ঘ আট বছর চাকরির পরীক্ষার দুয়ারে করাঘাত করেও বিফল হয়ে শেষমেশ আত্মাহুতির পথ বেছে নিয়েছিলেন। এটি কেবল এক যুবকের আর্তনাদ নয়, বরং কয়েক লক্ষ বেকার তরুণের মৌন হাহাকার। বেকারত্ব থেকে আত্মহত্যার পেছনে বেশ কয়েকটি সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক কারণ কাজ করে। ‘সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ পাচ্ছে না মানে অযোগ্য’- এমন চিন্তা। আত্মীয় বা বন্ধুর সাফল্যের সঙ্গে নিজের ব্যর্থতা তুলনা করে লজ্জা বোধ। দীর্ঘদিন বেকার থাকলে আত্মমর্যাদা কমে যায়। পরিবারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা বিশেষ করে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হলে চাপ আরও বেড়ে যায়। ডিপ্রেশন (হতাশা) দীর্ঘদিন বেকার থাকার ফলে বিষন্নতা দেখা দেয়। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় নিজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পাওয়া।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইএলও এবং সানেম -এর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষিত বেকারত্বের হার বাংলাদেশে আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বেকারত্ব হলো একটি সামাজিক ক্যানসার, যা মেধাকে কুরে কুরে খায় এবং উগ্রবাদ ও নৈরাজ্যের পথ প্রশস্ত করে। অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করছেন যে, এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি এখনই উৎপাদনশীল খাতে রূপান্তর করা না যায়, তবে জাতির ভবিষ্যৎ এক অন্ধগলিকে স্পর্শ করবে। তবে এই ঘনঘোর অন্ধকারের ওপারেই রয়েছে নতুনের আবাহন। বেকারত্বের এই মরণনেশা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল সংস্কার অপরিহার্য। কেবল সনদের পেছনে না ছুটে তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্ববাজারের উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তোলাই আজ সময়ের শ্রেষ্ঠ দাবি। রাষ্ট্রকে কেবল বড় বড় অবকাঠামো নয়, বরং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিতে হবে। আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের ভিত্তি হবে তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি; তাই তাদের মেধা ও শ্রমকে অবহেলার ডাস্টবিনে না ফেলে সঠিক পরিচর্যায় জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, হতাশা কোনো গন্তব্য নয়, বরং এক ক্ষণস্থায়ী মেঘ। সমাজ যদি বিদ্রূপের পরিবর্তে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং তরুণরা যদি আকাশছোঁয়া স্বপ্নের সাথে ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রমের মেলবন্ধন ঘটায়, তবে বেকারত্বের এই রূঢ় মরুপথ পাড়ি দিয়ে সাফল্যের সোনালি সৈকতে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু নয়। মনে রাখতে হবে, রক্তিম সূর্যোদয়ের আগেই রাত্রির অন্ধকার সবচেয়ে ঘনীভূত হয়।
আরও পড়ুন
লেখক
সাদিয়া ইসলাম কাসফিয়া
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








