ভিডিও বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২

প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৪:৫৩ দুপুর

সম্পর্কগুলো আটকে যাচ্ছে স্মার্টফোনে

আধুনিক জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ স্মার্টফোন। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এই ডিভাইসটি। অনেকের ঘন্টাখানেক সময়ও কাটে না স্মার্টফোনে চোখ না রেখে। কাজ, বিনোদন, খবর, সামাজিক যোগাযোগ সবকিছুই এখন আকৃষ্ট করছে ফোনের এই ছোট্ট পর্দাটি। স্মার্টফোনের এই দুর্নিবার আকর্ষণকে অস্বীকার করার উপায় যেমন নেই, তেমনি এর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে মানবিক সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে, তা নিয়ে উদ্বেগেরও যথেষ্ট কারণ আছে। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে-যে সময়টি আমরা ফোনের পর্দায় দিচ্ছি সেটি কিন্তু আসছে পরিবারের সঙ্গে বসে গল্প করার সময় থেকে, বন্ধু বা প্রিয়জনের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের সময় থেকে, সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় থেকে। অর্থাৎ মুখোমুখি কথোপকথন, স্নেহ-ভালোবাসা, আবেগ ও পারস্পরিক ভাব প্রকাশের মধ্য  দিয়ে গড়ে ওঠা যে চিরন্তন মানবিক সম্পর্ক, সেখানে এখন জায়গা করে নিয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির স্মার্টফোন। মানুষের জীবনে সম্পর্ক শুধু পাশাপাশি থাকা নয় বরং পরস্পরের সঙ্গে চোখে চ্খো রেখে আন্তরিকভাবে কথা বলা, শোনা ও অনুভব করার বিষয়। প্রযুক্তির এই চরম বিকাশের আগে মানুষে মানুষে বোঝাপড়া ও হার্দিক বন্ধনের মাধ্যমই ছিল মুখোমুখি কথোপকথন। প্রযুক্তি নির্ভর এই সময়ে এসে সেই মন খুলে কথা বলার জায়গাটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। যন্ত্রটির প্রতি আজ আমরা এতটাই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি যে আমরা কথা বলার মানুষ হয়েও অজান্তে নীরব হয়ে যাচ্ছি,আমাদের মানবিক সম্পর্কগুলোর মধ্যেও এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে চলেছে। মানুষ একসঙ্গে থাকছে বটে কিন্তু সেই থাকাটাকে আত্মিক বন্ধন বলা যাবে না। এক টেবিলে বসে খাওয়া হলেও চোখ থাকে ফোনের স্ক্রিনে। কানে থাকে হেডফোন। বাবা মা সন্তানের কথা শোনার পরিবর্তে ব্যস্ত থাকেন ফোনে। ফলে পরিবারের ভেতরে আবেগময় যোগাযোগ, সমস্যা,ভয় কিংবা আনন্দ শেয়ার করাটা তেমন আর হচ্ছে না। জমে থাকছে তা ভেতরে। দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্মার্টফোন  এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের শেষে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে স্বাভাবিক আলাপটি হওয়ার কথা,তা প্রায়ই আটকে যাচ্ছে ফোনের পর্দায়। ফলে ভালোলাগা,না লাগা,ছোটখাটো অভিযোগসহ জমে থাকে যে না বলা কথাগুলো, তা এক সময় বিরক্তি,হতাশা বা ক্ষোভের জন্ম দেয়,যা ধীরে ধীরে সম্পর্কের মধ্যে ফাটলও সৃষ্টি করে। তরুণ প্রজন্মের বন্ধুত্ব এখন আর আড্ডা,ভাব বিনিময় কিংবা দীর্ঘ আলাপের মধ্যে থাকছে না,সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে চ্যাট,স্টোরি,আর রিলসের মধ্যে। অনলাইনে সক্রিয় থাকাই যেন এখন সম্পর্কের একমাত্র প্রমাণ ।কিন্তু শারীরিক উপস্থিতিতে কথোপকথনের অভাবে তরুণদের মধ্যে যে সামাজিকভাবে মেলামেশার দক্ষতা,ধৈর্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতার জায়গাটি হারিয়ে যাচ্ছে,তারা যে একা হয়ে পড়ছে,তা আমাদের ভাবনাতেও নেই। সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবটা পড়ছে শিশুদের ওপর। শিশুরা বড় হচ্ছে এমন এক পরিবেশে,যেখানে বড়রাই ফোনের স্ক্রিনে বেশি সময় কাটান। ফলে তারা শেখে না কীভাবে অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়,কীভাবে অন্যের কথা মন দিয়ে শুনতে হয়,বুঝতে হয়। শিশুরা ছোটবেলা থেকে  সম্পর্ক গড়ে তোলা না শিখলে সমাজ ও দেশ নিয়ে ভাবার সক্ষমতাই থাকবে না তাদের। বুঝতে হবে-স্মার্টফোন নিজে কোন সমস্যা নয়,সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এটির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। কোন কিছুরই মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কল্যাণকর নয়। আমরা যন্ত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়াতে গিয়ে সম্পর্কগুলোর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করতে ভুলে যাচ্ছি। অথচ মানুষ বাঁচে কথোপকথনে ও উপস্থিতিতে। তাই মানুষের প্রতি মনোযোগ বাড়ানোই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। স্মার্টফোন হাতে হাতে থাকতেই পারে কিন্তু লক্ষ রাখতে হবে-সম্পর্কগুলো যেন বন্দি হয়ে না পড়ে ফোনটির পর্দার ভেতরে। দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো-মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে স্মার্টফোন এখন অনেকটাই আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে। স্মার্টফোনের অপরিহার্যতা মেনে নিয়েও মানুষে মানুষে সম্পর্ক গভীর করার প্রয়োজনে এই আসক্তি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা না করে উপায় নেই। সেই বিবেচনায় আমরা ফোনটি ব্যবহারের একটি সময় নির্দিষ্ট করতে পারি। সেটি হতে পারে কল করা বা সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ। মোবাইলে বিভিন্ন ধরনের অবিরাম নোটিফিকেশন আসে এবং তা ঘন ঘন চেক করতে গিয়ে  সময় ও মনোযোগ নষ্ট হয়। এক্ষেত্রে নোটিফিকেশন অফ করে রাখা যেতে পারে। ফোনে প্রবেশের পাসওয়ার্ডটি দীর্ঘ সংখ্যার করা যেতে পারে। এতে বারবার ফোনে প্রবেশ করায় অনাগ্রহ সৃষ্টি হবে। হাতের কাছে থাকলে মোবাইলটি বারবার দেখতে ইচ্ছে করবে। তাই যে কোন কাজ শুরু করার আগে ফোনটি হাতের নাগালের বাইরে রাখা যায়। মোবাইল আমাদের বই পড়ার সুন্দর অভ্যাসটিকে কেড়ে নিয়েছে। অবসরের যে কোন একটি সময়ে ঘন্টাখানেকের জন্য হলেও মোবাইল সেটটি দূরে রেখে বই পড়ার  দিকে মনোনিবেশ করে বই পড়ার অভ্যাসটি ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। এছাড়া স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে বেশি সময় তাকিয়ে থাকলে ঘুমের ব্যাঘাতসহ শরীরের যে মারাত্মক ক্ষতিগুলো হয়-সেগুলো এড়ানোর জন্যও স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে নিজেকে বিরত রাখার একটি প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলতে হবে নিজের ভেতরে। কাজটি শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই,যেহেতু পরিবারই সমাজের মূল ভিত্তি। 

 

লেখকঃ

আরও পড়ুন

রাহমান ওয়াহিদ

কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পয়েন্ট হারাল ম্যানসিটি ও ম্যানইউ

নির্বাচনে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কার্ড পেতে আবেদন অনলাইনে

আরও কয়েক দিন থাকবে শৈত্যপ্রবাহ 

মালয়েশিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার

ঢাবিতে শেখ পরিবারের নামে থাকা পাঁচ স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে আজ

প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করে স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে বার্সা