ভিডিও বুধবার, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২

প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৪:৪৯ দুপুর

সীমান্ত নিরাপত্তা: চ্যালেঞ্জ, বাস্তবতা ও করণীয়

যেকোনো সার্বভৌম দেশের জন্য সীমান্ত রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সীমান্ত সুরক্ষা শুধু বহিরাগত অনুপ্রবেশ বা শত্রুপক্ষকে প্রতিহত করাই নয়; বরং দেশীয় মুদ্রা পাচার, মানবপাচার, অস্ত্র, মাদক, গবাদিপশু ও ভোগ্যপণ্য চোরাচালান প্রতিরোধের মতো ব্যাপক দায়িত্বও এর সঙ্গে জড়িত। একটি শক্তিশালী সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেশকে অভ্যন্তরীণভাবে স্থিতিশীল রাখে এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

বাংলাদেশের প্রায় ৪৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম জটিল সীমান্তগুলোর একটি। এই বিশাল সীমানার মধ্যে ভারতের সঙ্গে রয়েছে ৪০৯৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ৩৩১ কিলোমিটার সংযোগ। নদী, পাহাড়, ঘন বন, চরাঞ্চল এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতি সীমান্ত পাহারাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। সীমান্ত এলাকায় দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক লোভ, এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রায়ই দেখা যায়। একই সঙ্গে মাদক, অস্ত্র, নারী ও শিশু পাচারসহ নানামুখী অপরাধ প্রতিদিনই সীমান্ত নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ভারতীয় সীমান্ত দিয়েই প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার মাদক বাংলাদেশে ঢোকে। অস্ত্র পাচার অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতা বৃদ্ধি করে। আর সীমান্তের ভূগোলের জটিলতা, অপর্যাপ্ত জনবল, প্রযুক্তিগত ঘাটতি এবং কঠিন আবহাওয়া বিজিবির জন্য এই পরিস্থিতিকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। তবু তারা প্রতিনিয়ত সীমিত সম্পদ নিয়েও কাজ করে যাচ্ছে।

সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে বিজিবির ইতিহাসও উজ্জ্বল। ব্রিটিশ আমলে তাদেরকে যদিও দমনমূলক বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তবে ১৯৭১ সালে তারা বাঙালিদের পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় যা তাদের দায়িত্ব ও দেশপ্রেমের প্রমাণ। স্বাধীনতার পর তাদের কাজের পরিধি আরও বেড়েছে। দেশের নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি তারা মানবিক সেবা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তা এবং উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে।

সীমান্তরক্ষীদের প্রতিদিনের জীবনও অত্যন্ত কঠিন। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা টানা টহল দিতে হয়, পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়, আবার জঙ্গল, পাহাড় ও নদীর মতো বিপজ্জনক পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনা বা বিনা কারণে গুলিবর্ষণের মতো দুর্ঘটনা। এসব ঘটনার পাশাপাশি দীর্ঘদিন কঠোর পরিবেশে কাজ করার ফলে বিজিবি সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যে চাপ সৃষ্টি হয়, অনেকেই উদ্বেগ ও ক্লান্তিতে ভোগেন। 

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সীমান্ত রক্ষায় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র- মেক্সিকো সীমান্ত কিংবা ইউরোপ ও ভারতের সীমান্তে রাডার, সেন্সর, ইলেকট্রিক ফেন্স, বায়োমেট্রিক চেকপোস্ট, উন্নতমানের ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে নজরদারি আরও দ্রুত, নির্ভুল ও কার্যকর হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও সীমিত। ফলে বিপুল বিস্তৃত সীমান্তে কার্যকর নজরদারি বজায় রাখতে বিরাট ঘাটতি দেখা যায়। তারপরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজিবি সীমান্ত সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। নদী ও স্থল উভয় পথেই টহল বাড়ানো হয়েছে, বিশেষ করে মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত- বাংলাদেশ সীমান্তেও যৌথ টহল, ফ্ল্যাগ মিটিং ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে আগের চেয়ে কার্যক্রম আরও সমন্বিত হয়েছে। ২০২৪ সালে বিজিবি ১৫ লক্ষ ইয়াবা, ২০০০ ফায়ারআর্ম এবং ৫০০ টনের বেশি গবাদিপশু জব্দ করেছে। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর কক্সবাজার সীমান্ত থেকে উদ্ধার করা হয় ৩ লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা। এসব সাফল্য প্রমাণ করে, সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বিজিবি তাদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করছে। 

আরও পড়ুন

তবে সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ জরুরি। সীমান্ত অঞ্চলের ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক অবকাঠামো তৈরি, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা এবং বিজিবির সদস্য সংখ্যা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা জরুরি। সীমান্তরক্ষীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ ডাক্তার নিয়োগ এবং জীবনমান উন্নয়নেও উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা গেলে তারা অবৈধ পাচারের সাথে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমে যাবে। তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও সময়ের দাবি। অঞ্চলভিত্তিক সমন্বয় জোরদার করতে বিএসএফ-এর সঙ্গে প্রযুক্তি ভাগাভাগি এবং সার্ক বা  বিমসটেক প্ল্যাটফর্মে যৌথ আলোচনাও কার্যকর হতে পারে। অবশেষে বলা যায়, একটি দেশের শক্তিমত্তা ও নিরাপত্তার পরিমাপ তার সীমান্ত রক্ষার মানেই নির্ভর করে। তাই সীমান্ত রক্ষায় সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বিজিবি সদস্যরা প্রতিদিন যে ত্যাগ স্বীকার করছেন, তা জাতি হিসেবে আমাদের গভীর শ্রদ্ধার দাবি রাখে। তাদের সমস্যাগুলো সমাধানে এখনই যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয় এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অটুট থাকে।

লেখক 

লাবনী আক্তার শিমলা

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ায় সাবেক এমপি বাবলু ও তার স্ত্রী’র বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা

বগুড়ার সান্তাহারে দিনদুপুরে বাড়ির তালা ভেঙে ৭ ভরি সোনার গহনা চুরি

বিপিএলে দলীয় সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড চট্টগ্রাম রয়্যালসের

বগুড়াসহ ৪৪ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ হাড়কাঁপানো শীতে স্থবির জনপদ

রিটার্ন ও হলফনামার তথ্যে গরমিলকে ‘টাইপিং মিসটেক’ বললেন সারজিস

বগুড়ায় রোগীদের দেখতে হাসপাতালে সাবেক এমপি লালু