তওবা ও আত্মসংযমের প্রয়োজনীয়তা
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই—সে ভুলের মাঝেই ফিরে আসার পথ খুঁজে নিতে পারে। সেই ফিরে আসার নামই তওবা। আর তওবাকে স্থায়ী ও ফলপ্রসূ করে যে গুণ, তা হলো আত্মসংযম। তওবা ও আত্মসংযমের সম্মিলনেই মানুষের অন্তর পরিশুদ্ধ হয় এবং সমাজে ফিরে আসে নৈতিক শুদ্ধতা। তওবা কেবল পাপ স্বীকারের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হৃদয়ের গভীর অনুতাপ, ভুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার দৃঢ় সংকল্প এবং আল্লাহর দিকে নতুন করে যাত্রা শুরু করার অঙ্গীকার।
কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন,
‘যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা যুমার: ৫৩)
এই আয়াত মানবজাতিকে আশ্বাস দেয়—ভুল যত বড়ই হোক, তওবার দরজা কখনো বন্ধ হয় না। অন্য আয়াতে তিনি বলেন,
‘হে মুমিনগণ, তোমরা তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা নূর: ৩১)
তওবার ফলাফল ও ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন,
‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি তওবা করো, তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে সমৃদ্ধ করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগানসমূহ ও প্রবাহিত নদী সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা নূহ: ১০–১২)
তওবার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রশান্তি ও যাবতীয় কল্যাণ লাভ করে। এটি আত্মাকে হালকা করে, বিবেককে জাগ্রত করে এবং জীবনে নতুন আলো জ্বালায়। পরকালে এর প্রতিদান হলো চিরশান্তি ও আল্লাহর করুণা।
তওবার অন্যতম শর্ত হলো—ইমান গ্রহণ, মৃত্যুর আগেই তওবা করা, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়তে তওবা করা, পাপ বর্জনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া এবং কৃত পাপের জন্য গভীর অনুতাপ প্রকাশ করা। মানুষের হকসম্পর্কিত পাপ হলে প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়াও অপরিহার্য। কারণ আত্মসংযম ছাড়া তওবা যদি কেবল ক্ষণিকের আবেগ হয়, তবে তা দ্রুতই ভেঙে পড়ে।
আত্মসংযম মানে শুধু ইচ্ছা দমন নয়; এটি সচেতন নিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক সীমার মধ্যে থাকার সাধনা। ইসলামে আত্মসংযমের শিক্ষা সর্বত্র—চোখের হিফাজত, জিহ্বার সংযম, হালাল-হারামের পার্থক্য রক্ষা ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
বর্তমান সমাজে ভোগবাদ, লোভ ও তাৎক্ষণিক তৃপ্তির সংস্কৃতি মানুষকে সহজেই ভুলের দিকে ঠেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্মুক্ততা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার মোহ সংযম হারানোর পথ প্রশস্ত করে। এর ফল হিসেবে ব্যক্তিগত অশান্তি, পারিবারিক ভাঙন ও সামাজিক অবক্ষয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে তওবা আশ্রয়, আর আত্মসংযম সেই আশ্রয়ের স্থায়ী ভিত্তি।
তওবা মানুষকে আশাবাদী করে তোলে। তওবাকারী ব্যক্তি অতীতকে বোঝা নয়, বরং শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে। আত্মসংযম তাকে ভবিষ্যতে সঠিক পথে চলতে সহায়তা করে। যেমন নদীর তীরে বাঁধ না থাকলে পানি ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতি করে, তেমনি সংযম ছাড়া আবেগ ও প্রবৃত্তি জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। সংযম সেই বাঁধ, যা শক্তিকে কল্যাণের পথে প্রবাহিত করে।
ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও তওবা ও আত্মসংযম অপরিহার্য। দুর্নীতি, মিথ্যাচার ও হিংসার মূলেও রয়েছে সংযমের অভাব। ব্যক্তি যখন নিজের ভুল স্বীকার করে সংশোধনের পথে হাঁটে, তখন সমাজও সুস্থতার দিকে অগ্রসর হয়। তওবা সম্পর্ককে মেরামত করে, আত্মসংযম পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা বাড়ায়।
তওবা ও আত্মসংযমের পথ সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। নিয়মিত আত্মসমালোচনা, ইবাদতে যত্ন, নেক সঙ্গ এবং সৎ পরিবেশ এই পথে সহায়ক। বিশেষ করে নীরব মুহূর্তে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন—আমি কোথায় ভুল করেছি, কোথায় সংযম হারিয়েছি—এই প্রশ্ন মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে।
তওবা মানুষকে আলোর দিকে ফেরায়, আর আত্মসংযম সেই আলোকে ধরে রাখে। এই দুই গুণ ছাড়া ব্যক্তির মুক্তি যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি সমাজের শান্তিও দুর্লভ। অস্থির এই সময়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অন্তরের এই সংস্কার—ভুল থেকে ফিরে আসার সাহস এবং সঠিক পথে অবিচল থাকার শক্তি। তওবা ও আত্মসংযমের এই যুগল সাধনাই মানুষকে মানুষ করে তোলে এবং সমাজকে দিতে পারে স্থায়ী শান্তি।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








