যেভাবে কাটতো নবী কারিম (সা.)-এর রমজান
রমজান কেবল ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে রমজান ছিল ইবাদত, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সমাজসেবার এক অপূর্ব সমন্বয়। তাঁর প্রতিটি কাজ আমাদের জন্য এক জীবন্ত আদর্শ।
১. সেহরি: বরকতময় সূচনা
নবীজি (সা.)-এর দিন শুরু হতো সেহরির মাধ্যমে। তিনি ফজরের ঠিক অল্প সময় আগে সেহরি গ্রহণ করতেন। তাঁর সেহরি ছিল অত্যন্ত সাধারণ—কয়েকটি খেজুর বা সামান্য আহার। তিনি বলতেন:
“তোমরা সেহরি খাও; কারণ সেহরিতে বরকত আছে।” (সহিহ বোখারি: ১৯২৩)
২. দিনের আমল: ইবাদত ও সংসারের ভারসাম্য
রমজানের দিনে নবীজি (সা.) মসজিদে ফরজ নামাজে ইমামতি করতেন। তবে ইবাদতের দোহাই দিয়ে তিনি পারিবারিক দায়িত্ব অবহেলা করতেন না। উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা মতে, তিনি ঘরে স্ত্রীদের কাজে সাহায্য করতেন, নিজের কাপড় সেলাই করতেন এবং ছাগলের দুধ দোহন করতেন। (সহিহ বোখারি: ৫৩৬৩)
শিক্ষা: রমজান মানে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, বরং দায়িত্ব ও ইবাদতের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা।
৩. ইফতার: সরলতা ও তৃপ্তি
ইফতারের সময় হলে নবীজি (সা.) দোয়া ও জিকিরে মশগুল থাকতেন। তিনি বিলাসবহুল আয়োজন নয়, বরং সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতার করতেন:
-
প্রথম পছন্দ: তাজা পাকা খেজুর।
-
বিকল্প: শুকনো খেজুর (খুরমা)।
-
অন্যথায়: কয়েক চুমুক পানি। (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৬)
আরও পড়ুন
৪. তারাবি ও রাতের ইবাদত (কিয়ামুল লাইল)
নবীজি (সা.) উম্মতের কষ্টের কথা চিন্তা করে তিন দিন জামাতে তারাবি পড়ার পর তা ঘরে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। রমজানের রাতগুলো ছিল তাঁর অশ্রুসিক্ত দীর্ঘ মোনাজাত আর গভীর তেলাওয়াতের সময়। তিনি বলতেন:
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাত জেগে ইবাদত করে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বোখারি: ২০০৯)
৫. কোরআন ও দানশীলতা
রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। প্রতি রমজানে হযরত জিবরাইল (আ.)-এর সাথে নবীজি (সা.) কোরআন দাওর (খতম) করতেন। এছাড়া এই মাসে তাঁর দানশীলতা কয়েক গুণ বেড়ে যেত। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, রমজানে নবীজি (সা.)-এর দানশীলতা "প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও দ্রুত" সবার কাছে পৌঁছে যেত। (সহিহ বোখারি: ৬)
৬. শেষ দশক: ইতিকাফ ও কদরের সন্ধান
রমজানের শেষ ১০ দিন এলে নবীজি (সা.) কোমর বেঁধে ইবাদতে নামতেন। তিনি নিজে রাত জাগতেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও ইবাদতের জন্য জাগিয়ে তুলতেন। (সহিহ বোখারি: ২০২৪) লাইলাতুল কদরের সন্ধানে তিনি এই বিশেষ দোয়াটি বেশি পড়তেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।
নবীজি (সা.)-এর রমজান আমাদের শেখায় যে, ইবাদত মানে কেবল উপবাস নয়, বরং এটি হলো চরিত্র সংশোধন, পরোপকার এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করার নাম।
মন্তব্য করুন








