বিপ্লবের নায়ক জিয়াউর রহমান: খাদের কিনারা থেকে যেভাবে ঘুরে দাঁড়ায় দেশ
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের দিন। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দেশ। এমন পরিস্থিতিতে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান রাষ্ট্রক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনে। এর মধ্য দিয়েই তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন।
১৯৭৫ সালজুড়েই নানা সংকটে ছিল বাংলাদেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এ হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। তবে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চেইন অব কমান্ড, নেতৃত্ব ও ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এর ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এ সময় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়। বিষয়টি সেনাসদস্যদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি করে। ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত চার দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্তরে জমে থাকা অসন্তোষ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ছিল এর অন্যতম পটভূমি। বিদ্রোহী সৈনিকরা গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করেন জিয়াউর রহমানকে। পরে সৈনিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ঘটনাটি ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এ সময় ঢাকার রাজপথে সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক ও ট্রাক চলাচল করে এবং বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজধানী।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন জিয়াউর রহমান?
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের গুরুত্বের অন্যতম কারণ ছিল তাঁর সেনাপ্রধানের পদ ও গৃহবন্দি হওয়ার ঘটনা। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তাঁকে সরিয়ে দেওয়ায় সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তাঁর মুক্তির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণে পরিবর্তন আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জিয়াউর রহমানের সামরিক পরিচিতি এবং মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা তাঁকে সেনাসদস্যদের একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। ৭ নভেম্বরের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় তাঁর প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন।
মুক্তিযোদ্ধা থেকে রাষ্ট্রপতি
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের পর তিনি বিদ্রোহ করেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে আলোচনায় আসেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বীর উত্তম’ খেতাব পান।
তবে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পরপরই তিনি রাষ্ট্রপতি হননি। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমানসহ তিন বাহিনীর প্রধানকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হয়।
আরও পড়ুন১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বিএনপি প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক পরিবর্তন
রাষ্ট্রক্ষমতায় অবস্থান সুসংহত করার পর জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। দলটির রাজনৈতিক দর্শনে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাঁর শাসনামলে মুক্তবাজার অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের বিকাশ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি ও বৈদেশিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় বিভিন্ন পরিবর্তন আনে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলমগীর হোসেন সম্রাট বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। গৃহবন্দি সেনাপ্রধান থেকে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল।
অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ৭ নভেম্বরকে জাতীয় ইতিহাসের অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে নতুন পথ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল এবং এ ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন জিয়াউর রহমান।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান শুধু একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন না, তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানায়কও ছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
শামসুজ্জামান দুদু আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা জরুরি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই দিনটি জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও ঐক্যের চেতনার সঙ্গে জড়িত। ইতিহাসের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা স্মরণ করা উচিত।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








