ভিডিও বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৩৫ পিএম

আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে সহজ আমল কী?

আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে সহজ আমল কী?

এক সাহাবি এসে বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, ইসলামের মধ্যে তো অনেক আমল আছে; কিন্তু ফরজের পরে নফল ইবাদতের মধ্যে আমি খুব একটা সুবিধা করতে পারি না। তাই আপনি আমাকে এমন একটি সহজ আমলের কথা বলুন, যেটা বললে আমার মোটামুটি কাজ হয়ে যাবে এবং আমি সেটা খুব ভালো করে আমল করতে পারব।’নবীজি (সা.) তাকে বললেন, ‘তাহলে এক কাজ করো, তোমার জিহ্বাটাকে আল্লাহর জিকির দ্বারা, আল্লাহর স্মরণ দ্বারা সব সময় সিক্ত বা ভেজা রাখো।

’সাহাবি ফরজ ইবাদত তো কোনোভাবেই বাদ দিতে পারবেন না, কিন্তু নফল ইবাদত বেশি করার ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে হয়তো পেরে ওঠেননি। তখন তিনি জানতে চাইলেন যে, অতি সহজেই কোন নফল ইবাদতটি ধরে রাখলে আল্লাহ তাআলা তাকে অনেক নেকি দান করবেন। উত্তরে নবীজি (সা.) তাকে বললেন যে, তোমার জিহ্বাকে সবসময় আল্লাহর জিকির দ্বারা সচল রাখো।আল্লাহ তাআলার জিকির হলো সবচেয়ে সহজ ইবাদত। আর সেটিকে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বড় ইবাদত বলেছেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ।’ (সুরা আনকাবুত: ৪৫) যদিও সেই আল্লাহর জিকিরের মধ্যে সব ইবাদত ঢুকে যায়। যেমন নামাজের মধ্যেও জিকির আছে, নামাজ হলো অনেক বড় জিকির।

আল্লাহ বলেছেন, ‘আমার স্মরণের জন্য সালাত কায়েম করো।’ নামাজের পরেও এই যে নফল আজকারের সুযোগ রয়েছে, তা আমরা খুব সহজেই করতে পারি। অথচ আমরা দিন ও রাত পার করে দিচ্ছি, জিকিরের মাধ্যমে নেকির আমলগুলো ভর্তি করতে পারছি না আমাদের চরম গাফলতির কারণে।আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাকে স্মরণ করার জন্য খুব বেশি করে নসিহত করেছেন কোরআন এবং হাদিসে। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তাআলাকে অনেক বেশি বেশি করে জিকির করো, স্মরণ করো। সকাল ও সন্ধ্যায় বেশি করে আল্লাহর জিকির করো। এবং তিনি বলেছেন যে, বেশি করে জিকির করো, তাহলে তোমরা নিশ্চিত কামিয়াব হয়ে যাবে।জিকির সহজ আমল হলেও মানুষকে আল্লাহর অনেক কাছে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে, শয়তান তার কাছে বেশি সুবিধা করতে পারবে না।

যে বাড়িতে বেশি করে আল্লাহর জিকির করা হয়, সে বাড়িতে বা সেই ঘরে শয়তান বেশি সুবিধা করতে পারে না; এটি হলো সুদৃঢ় প্রটেকশন বা নিরাপত্তা।আপনি আল্লাহ তাআলাকে ডাকছেন, আর আল্লাহ তাআলা আপনাকে শয়তানের হাতে ছেড়ে দেবেন এটি কি কখনো সম্ভব? অসম্ভব! কিন্তু যখন মানুষ আল্লাহ তাআলাকে ডাকবে না, জিকির করবে না, তখন শয়তান তার ওপরে চড়াও হয়ে যাবে। তার ঘরে অশান্তি ঢুকিয়ে দেবে এবং তার নিজের মানসিক কষ্ট দূর হওয়ার আর কোনো রাস্তা থাকবে না।

কোরআনের আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পরম করুণাময়ের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে থাকে, আমি তার জন্য একজন শয়তান নিযুক্ত করে দিই, সে তার সঙ্গী হয়।’ (সুরা জুখরুফ: ৩৬) ফলে শয়তান তাকে ছাড়ে না, খামাখা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে যায়, ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্ব পয়দা হয় এবং ঝগড়াফাসাদ লেগেই থাকে। কারণ শয়তান তার সঙ্গী হয়ে গেছে।জিকির না করলে আমরা আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে নিরাপত্তা বা প্রটেকশন পাই না। অতি সহজে শয়তানের খপ্পরে পড়ে যাই। একটি কিতাব রয়েছে, যেখানে দিনে-রাতে, সকাল-সন্ধ্যায়, শোয়ার আগে-পরে, খাওয়ার আগে-পরে এবং প্রতিটি কাজের আগে-পরে পড়ার মতো অজস্র দোয়া রয়েছে। এই কিতাব যিনি লিখেছেন, তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘হিসনুল মুসলিম’, যার অর্থ হলো শয়তান থেকে সুরক্ষিত থাকার দুর্গ।

এই জিকির এবং দোয়াগুলো যে কত বড় নেয়ামত! একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুফাররেদুনরা অনেক কামিয়াব হয়ে গেল।’ সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, মুফাররেদুন কারা?’ তিনি বললেন, ‘যারা অনেক বেশি আল্লাহকে ডাকে, জিকির করে, দোয়ার মধ্যে লিপ্ত থাকে এবং সকাল-সন্ধ্যা তসবিহ পড়ে, এরা সবার আগে কামিয়াব হয়ে গেল।’যে বাড়িতে স্বামী জিকির করে না, স্ত্রীও পড়ে না, বাবাও পড়ে না, মাও পড়ে না এবং ছেলেমেয়েরাও করে না, ওই বাড়িটা একটা মৃত বাড়ির মতো। বাড়িটার মধ্যে কোনো প্রাণ নেই। বাড়িটা হলো শয়তানের আড্ডাখানা।

আর যে মানুষের জবানে আল্লাহর জিকির নেই, সে ব্যক্তি একটি মৃত মানুষের মতো। আর যে ব্যক্তির জবানে আল্লাহর জিকির অনেক বেশি আছে, সে ব্যক্তি একটা জিন্দা মানুষ, জিন্দা দিল।জিকির করে দেখুন আল্লাহ তাআলা অন্তরে অনেক সান্ত্বনা, তৃপ্তি ও নিরাপত্তা দান করবেন; আর যখন জবানে জিকির থাকবে না, তখন কত দুশ্চিন্তা আমাদের কষ্ট দেবে! বদমেজাজে মুখে দিয়ে ভালো কথা আসবে না এবং এ রকম আরও নানা সমস্যায় আমরা পড়ে যাই।

আরও পড়ুন

অন্তরের মধ্যে কত রকমের দুশ্চিন্তা ও কুচিন্তা এসে বাসা বাঁধে! কিন্তু আল্লাহ তাআলা যে ব্যক্তি বেশি বেশি করে আল্লাহকে ডাকে, তার অন্তরটাকে একেবারে নিরাপত্তা ও শান্তিতে নিশ্চিত করে দেন।আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, আমাকে ডাকার জন্য বা জিকির করার জন্য একেবারে বসে কায়দামতো করতে হবে, এটা জরুরি নয়। দাঁড়ানো অবস্থায় আমাকে ডাকো, বসা অবস্থায় ডাকো, শোয়া অবস্থায় ডাকো। শুয়ে শুয়েও জিকির করা যায়। ক্লান্ত হয়ে গেলে অজু ছাড়াও জিকির করা যায়। এত সহজ একটা ইবাদত, যেটা আমাদের আমলনামাকে সওয়াবে ভর্তি করতে থাকে!জিকির হচ্ছে একটি বড় লক্ষণ।

যে ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ তাআলার সম্পর্ক আছে, এর প্রমাণ হচ্ছে যে সে বেশি বেশি আল্লাহকে ডাকে ও জিকির করে। ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, কোনো মানুষ যদি কাউকে ভালোবাসে, তাকে কি সহজে ভুলতে পারে? তার কথা বার বার মনে পড়ে, তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে এবং যত কথা বলি, ততই যেন ভালো লাগে!আল্লাহ তাআলার জিকির আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণ। আর আল্লাহকে ভালোবাসলে সেই ভালোবাসা কি কখনো একতরফা হবে?

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমাদের ভালোবাসা ফেরত দেবেন! যে প্রিয়জনকে খুব মহব্বত করে, প্রিয়জনের কথা ভুলতে পারে না, ঠিক তেমনি বান্দার সঙ্গে আল্লাহরও এমন এক মহব্বতের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে যায় জিকিরের মাধ্যমে।জুনুন মিসরি (রহ.) বলতেন, দুনিয়ার আর কোনো কিছুর মধ্যে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করে আল্লাহকে ডাকার মতো এত বড় মজা আর কোনোটার মধ্যেই নেই। খাওয়া-দাওয়া, দাম্পত্য জীবন থেকে শুরু করে ধনসম্পদ, বাড়ি-গাড়িএগুলোর কোনোটির মধ্যেই এত আনন্দ নেই, আল্লাহ তাআলার সঙ্গে জিকিরের মাধ্যমে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় এবং যে আনন্দ পাওয়া যায়।আর আখেরাতে তো আল্লাহর ক্ষমা না পেলে কারও জন্যই কল্যাণকর কিছু হবে না।

এমন কি জান্নাতেও এত আনন্দ আসবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলার দিদার বা সাক্ষাৎ অর্জন হয়েছে। আল্লাহর দিদার লাভ করাই হলো জান্নাতের সবচেয়ে বড় নিয়ামত। আর যারা দুনিয়াতে আল্লাহকে ভালোবেসেছেন, তাদের জন্যই তো সেই মহান নিয়ামত অপেক্ষা করছে।জুনুন মিসরি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি তার অন্তর ও জবান আল্লাহ তাআলার জিকির দ্বারা ব্যস্ত রাখে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে নিজের প্রতি আকর্ষণ এবং সম্পর্কের সেই সুমধুর আনন্দ একেবারে ঢেলে দেবেন।তাহলে আমরা এখন কী দিয়ে নিজেদের ব্যস্ত রাখি? আমাদের হাতে তো এখন মোবাইল ফোন আছে! ব্যস্ত রাখার এক বিরাট জিনিস জোগাড় হয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে আমাদের সমস্ত সময় চলে যাচ্ছে।

সকাল-সন্ধ্যা যে এতগুলো জিকিরের লিস্ট রয়েছে কিংবা শোয়ার আগের দোয়াগুলো তার কোনোটির খবরই আমাদের নেই! ওই মোবাইল হাতে করে আমরা সব জায়গায় আছি, শোয়ার আগেও মোবাইল দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যাচ্ছি।

এর চেয়ে যদি আমরা আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক করি, সকাল-সন্ধ্যা থেকে শুরু করে নামাজের আগের ও পরের তাসবিহাত এবং দোয়াগুলো অর্থাৎ পুরো লিস্টটা প্রতিদিন পড়ি এবং কোনোদিন মিস না করি, তাহলে সে আল্লাহ তাআলার ‘যাকেরিন’ বা স্মরণকারী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। আর যারা আল্লাহ তাআলার জাকেরিন হয়ে যান, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যই জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে সহজ আমল কী?

১

পঞ্চগড়ের বৃদ্ধা আখিমনের পাশে তরুণ সমাজকর্মী আহসান

২

রাজশাহীতে বাড়ির ছাদে কৃষককে ছুরিকাঘাতে হত্যা

৩

দুনিয়া-আখেরাতের সফলতার জন্য অপরিহার্য যে ৩ আমল

৪

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে নিয়োগ, ১৮ বছর হলেই আবেদন

৫

বগুড়ায় রেলের জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যেকোনদিন অভিযান, বিভাগীয় কর্মকর্তার পরিদর্শন

৬