স্বপ্ন ২০৩৪: ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি!
আতাউর রহমান মিটন : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার জাতির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক এক স্বপ্ন বা প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন। বলা হচ্ছে আগামী ২০৩৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারের হবে। আমেরিকান ডলারের বর্তমান দর অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ সহজ কথায়, প্রায় ১২৩ লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় বাজেটের তুলনায় এই অর্থ প্রায় ১২-১৩ গুণ বেশি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় বড় স্বপ্ন, বড় বড় আশা এবং বড় বড় কথা বলার একটা প্রবণতা বিদ্যমান। যদিও নেতার কাজ স্বপ্ন তৈরি করা এবং স্বপ্ন পূরণের পথে পরিকল্পনা তুলে ধরা, সেই হিসেবে সরকারের এই উচ্চাশা ঠিকই আছে কিন্তু অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এই উচ্চাশা পূরণ সম্ভব নয়। নতুন সরকার নানামুখী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, সরকার তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন সেটার প্রতি যত্নশীল। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার ১৭তম বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের অর্থ বছর পরিবর্তন করার। অর্থ বিভাগের উদ্যোগে উত্থাপিত প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থবছর জুলাই-জুন। প্রস্তাবিত নতুন অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ।
উল্লেখ্য, জাপান, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক অনেক বড় বড় অর্থনীতির দেশ এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করে। কি লাভ হবে এই পরিবর্তনে? প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের আবহাওয়া, প্রকৃতি ও কৃষি অর্থনীতি বিবেচনায় এই কাঠামোগত পরিবর্তনের অনেকগুলো ভাল দিক রয়েছে। প্রায় ৫৫ বছর পর সরকারের নেয়া এই কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রধান গুরুত্ব ও সুবিধা হলো, সরকারের উন্নয়ন কাজের গতি বৃদ্ধি। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে বাজেট পাস ও অর্থ ছাড় করা সম্ভব হবে। তাতে করে শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মার্চ) টানা ৫-৬ মাস কোনো বাধার সম্মুখীন না হয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ নিরবচিছন, তাবে চালানো যাবে। এতে সরকার তথা জনগণের অর্থের ও অপচয় কমবে এবং সরকারি তহবিলের সঠিক ব্যবহার ও কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা সহজ হবে।
দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি তথা কৃষি উৎপাদন, সংগ্রহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যান্য লেনদেন গতিশীল হবে বিধায় জিডিপি ও প্রবৃদ্ধির হিসাব আরও নিখুঁতভাবে ফুটে উঠবে পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন এই অর্থবছর চালু হবে এপ্রিল ২০২৮ সাল থেকে। জুলাই ২০২৭ থেকে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাস বিবেচিত হবে অন্তর্বর্তীকালীন অর্থবছর হিসেবে। এর ফলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন হবে? অর্থনীতি যে কোন সমাজের বেসিক স্ট্রাকচার বা মৌল কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন তাই রাজনৈতিক গণতন্ত্র বিকাশের পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক গণতন্ত্রায়ন নিয়ে অনেক কথা, অনেক আন্দোলন হলেও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন নিয়ে আমরা খুব বেশি আলোচনা শুনিনা। অথচ অর্থনীতিতে সবার আগে নিশ্চিত করা দরকার সকল মানুষ সমান অংশগ্রহণের সুযোগ, খোলা রাখতে হবে সুযোগের দুয়ার সকলের জন্যে। এটা নিশ্চিত না হলে সমাজে বৈষম্য দূর হবে না। তেলা মাথায় তেল ঢালা বা ধনী আরও ধনী হওয়ার যে বৈষম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা সমাজে বিরাজমান তার পরিবর্তন কেবল অর্থবছর পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। অর্থনীতিতে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ সমান না করতে পারলে বৈষম্যমুক্ত সমাজ কেবল রাজনৈতিক শ্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
আরও পড়ুনআমাদের বিদ্যমান নাগরিক ভাবনা বড্ড শহরকেন্দ্রিক। ব্যাংক ও এনজিওগুলোতে সবচেয়ে বেশি সঞ্চয় গ্রামের মানুষের কিন্তু সেই টাকায় তাদের অধিকার সবচেয়ে কম। গ্রামের কৃষক সহজে ঋণ পায় না, অথচ শহরের বিত্তশালী ব্যক্তিরা কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়ে যান নিমিষেই। গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ যখন ঋণের সুদের চাপে ব্যবসা বন্ধ করার কথা ভাবেন তখন ঐসব বিত্তশালীরা তাদের শত কোটি টাকার সুদ মওকুফ পেয়ে যান সহজেই। এই বিত্তশালীদের অনেকেই সরকারের রাজনৈতিক আনুকূল্যে আশ্রিত বিধায় তাদের কেউ টিকিও স্পর্শ করতে পারে না। এটা কোনভাবেই সঠিক ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের নির্দেশক নয়। বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি। জিডিপিতে প্রায় ১২-১৩% অবদান রাখা এবং প্রায় ৪০% শ্রমশক্তির কর্মসংস্থান করা এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের চেতনায় সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের রাজনৈতিক গণতন্ত্রায়ন সুসংহত করা সম্ভব হবে না।
তারেক রহমান এর সরকার যে শুভ ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করছেন তা পূর্ণতা পাবে তখনই যখন সরকার জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবেন। মানুষ পুরানো ব্যবস্থায় ফেরত যেতে চায় না। তারা পরিবর্তন চেয়েছে জীবনে নতুন ছন্দ আসবে বলে। এর জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে মনোযোগ দিতে হবে। কৃষক সংগঠনগুলো তৈরি এবং সমবায়ের বাস্তবিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকার যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। শুভ চিন্তার জয় হোক!
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1788068554.jpg)
_medium_1787981127.jpg)
_medium_1787723104.jpg)
_medium_1787549411.jpg)
_medium_1787548880.jpg)
_medium_1787460863.jpg)


