ভিডিও সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট, ২০২৬ ১১:২২ এএম

ডিজিটাল পর্দায় বন্দি শিশুদের শৈশব

ডিজিটাল পর্দায় বন্দি শিশুদের শৈশব

সিনথিয়া ইসলাম খুশবু : শৈশব, আমাদের জীবনের সবচেয়ে মধুর এবং স্মৃতির পাতার এক উজ্জ্বল সময়। এই সময়ে কাটানো দিনগুলোর গুরুত্ব আমাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্ম কি তাদের শৈশবকে প্রবীণদের মতো স্মরণীয় করে তুলতে পারছে? নাকি আধুনিকতার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে তাদের শৈশব? বর্তমান প্রজন্মের রঙিন শৈশব হারিয়ে যাওয়ার পেছনে আমাদের চারপাশের পরিবেশ অনেকটাই দায়ী। 

আগে সন্ধ্যা হলেই খেলতে যাওয়া শিশুদের দল দেখা যেত। মাঠে কেউ ক্রিকেট খেলত, কেউ ফুটবল, আবার কেউ দল বেঁধে নানা ধরনের খেলায় মেতে উঠত। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। খেলার মাঠের অভাব এবং শহুরে ব্যস্ততার কারণে অনেক শিশুই ঘরে বসে ভিডিও গেম, কার্টুন কিংবা বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্টে তাদের সময় কাটাচ্ছে। প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দকে ক্রমাগত গ্রাস করে নিচ্ছে। 

শিশুদের শৈশব হারিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পিতা-মাতারও ভূমিকা রয়েছে। অনেকেই শিশুদের ফোনের পর্দার সঙ্গে এতটাই অভ্যস্ত করে ফেলেছেন যে, শিশুরা ধীরে ধীরে বাস্তব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শিশুদের বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্ত উপলব্ধি না করে পরে তা স্মৃতি হয়ে থাকবে, এই ভেবে অভিভাবকেরা অনেক সময় ক্যামেরায় সেই মুহূর্তগুলো বন্দি করে রাখেন। স্মৃতি ধরে রাখা অবশ্যই সুন্দর; কিন্তু সেই মুহূর্তটিকে সরাসরি অনুভব করার গুরুত্বও আমাদের মনে রাখা উচিত। কারণ ক্যামেরায় একটি মুহূর্ত ধরে রাখা যায়, কিন্তু সেই মুহূর্তের অনুভূতিটা পুনরায় ফিরে পাওয়া যায় না। শিশুর মস্তিষ্ক অত্যন্ত সক্রিয় ও অনুকরণশীল। তারা শৈশবে চারপাশে যা দেখে, অনেকটা সেভাবেই নিজেদের তৈরি করতে চায়। 

ডিজিটাল পরিবেশে বড় হওয়া একটি শিশু যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করে, তখন সে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকেই হয়তো নিজের সম্ভাবনার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ভাবতে পারে। কারণ ছোটবেলা থেকেই সে দেখে আসছে, তার প্রতিটি কাজ ক্যামেরাবন্দি হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে কনটেন্ট তৈরি করাকেই সে নিজের প্রতিভা মনে করতে পারে। অথচ তার মধ্যে অন্য কোনো প্রতিভা সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও সে হয়তো তা আবিষ্কার করার বা চেষ্টা করার সুযোগ পাচ্ছে না। এ কারণেই হয়তো আমাদের দেশে নতুন প্রতিভা বা নবীণ কিংবদন্তি তৈরি হওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। আমরা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাই এবং অযোগ্য ব্যক্তিদেরও দেশের শীর্ষ খবর বা আলোচনার বিষয় করে তুলি। ফলে যারা সত্যিকার অর্থে নতুন কিছু করার চেষ্টা করছে, তারা অনেক সময় নিজেদের কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অযোগ্য মানুষের বিলাসবহুল জীবন ও সাময়িক জনপ্রিয়তা কখনো কখনো যোগ্য মানুষকে নিরুৎসাহিত করে। 

একজন শিশু বা কিশোর যখন দেখে পরিশ্রম ও জ্ঞানচর্চার চেয়ে জনপ্রিয়তাই বেশি মূল্য পাচ্ছে, তখন তার মধ্যেও দ্রুত পরিচিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে। এ সমস্যার শুরু যেমন পরিবার থেকে, তেমন এর সমাধানও পরিবার থেকেই পাওয়া সম্ভব। শিশু শুধু তার মা-বাবার কাছ থেকেই শেখে না; পরিবারের প্রতিটি সদস্যই তার বেড়ে ওঠার অন্যতম উপকরণ। পরিবারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শিশুমনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের উচিত শিশুদের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটানো।

আরও পড়ুন

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা শিশুদের সময় না দিয়ে কোনো গেমস বা ভিডিও দিয়ে তাদের অবসর সময় কাটানোর ব্যবস্থা করি। কিন্তু শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবারের মানুষের সঙ্গে কথা বলা, খেলা এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ। তাদের ডিজিটাল জগৎ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা নয়, বরং ডিজিটাল জগতের পাশাপাশি বাস্তব জগতের সঙ্গে পরিচিত করার পরিবেশ সৃষ্টি করা আমাদের দায়িত্ব। তাদের নিয়মিত জ্ঞানচর্চার সুযোগ করে দিতে হবে। খেলাধূলা, বই পড়া, ছবি আঁকা, গান, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো; এসবের মধ্য দিয়েও শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হতে পারে। এছাড়াও বাস্তবসম্মত সমস্যার সমাধান শেখানোর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজনকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে, যেন তারা নিজেদের দুর্বলতা ও প্রতিভা চিহ্নিত করতে পারে। 

আমাদের চারপাশে প্রতিকূল পরিবেশ থাকায় ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অধিকাংশই স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা যদি ছোটবেলা থেকেই নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা আবিষ্কারের সুযোগ পাই, তাহলে এই সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সঠিক সময় আমাদের শৈশব। আর সেই শৈশবই যদি ডিজিটাল পর্দার মধ্যে বন্দি থাকে, তাহলে জীবনের অনেক সম্ভাবনাই অজানা থেকে যেতে পারে। তাই শিশুদের শুধু ক্যামেরায় বন্দি করে রাখলেই হবে না; তাদের শৈশবকে সত্যিকার অর্থে বাঁচার সুযোগ দিতে হবে। একটি শিশুর হাতে শুধু স্মার্টফোন নয়, বইও তুলে দিতে হবে; শুধু স্ক্রিন নয়, খেলার মাঠও দিতে হবে। কারণ শৈশব একবার চলে গেলে সেটি আর ফিরে আসে না।

লেখক: শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডিজিটাল পর্দায় বন্দি শিশুদের শৈশব

 হাছান মাহমুদ ও নওফেলসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য শুরু আজ

আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলার হাইকোর্টের রায় আজ

মাঝ আকাশে যাত্রীর ল্যাপটপ বিস্ফোরণে বিমানে আগুন

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী

বগুড়ায় সাবেক ইউপি সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা