ভিডিও বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রকাশ : ২০ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৫৮ এএম

উত্তরবঙ্গের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন: বদলাবে কি এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি

উত্তরবঙ্গের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন: বদলাবে কি এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি

ফারুক আহম্মেদ :  কৃষক ফসল ফলান, উৎপাদনের ঝুঁকি নেন; কিন্তু তাঁর উৎপাদিত ফসলের দাম কত হবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা তাঁর হাতে থাকে না। মৌসুমে উৎপাদন বাড়লে দাম পড়ে যায়, আবার কিছুদিন পর একই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। কৃষক কম দামে বিক্রি করেন, ভোক্তা বেশি দামে কেনেন। উৎপাদন ও ভোক্তার মাঝখানে তৈরি হওয়া এই মূল্য ব্যব্বানই উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলা দেশের কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান অঞ্চল। রংপুর বিভাগেই দেশের প্রায় অর্ধেক ভুট্টা, এক-তৃতীয়াংশ আলু, প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সবজি এবং প্রায় ১৭ শতাংশ চাল উৎপাদিত হয়। দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় এ অঞ্চলের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় কৃষকের আয় বাড়ছে না কাজিঙ্ক্ষত হারে। কারণ সমস্যা শুধু উৎপাদনে নয়; বড় ঘাটতি বয়েছে সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও বাজার সংযোগে।

এই বাস্তবতায় উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে এ পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে। অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন দেওয়া হবে এবং তারা উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারবে। তিন বছরের এ কর্মসূচিতে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ, বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানিতেও অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে।

 কর্মসূচির অর্থের ১৫ শতাংশ কৃষি উৎপাদনে, ৩৫ শতাংশ সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে, ৩৫ শতাংশ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে এবং ১৫ শতাংশ রপ্তানিতে ব্যবহারের কাঠামো রাখা হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে কৃষকের আয় বৃদ্ধি করা। সুযোগ আছে, জানেন কতজন? এখানেই বড় প্রশ্ন। কৃষক ও উদ্যোক্তারা যদি না জানেন কোন ব্যাংকে আবেদন করতে হবে, কী ধরনের প্রকল্প যোগ্য, ঋণের শর্ত কী এবং কী কাগজপত্র প্রয়োজন, তাহলে অর্থায়নের সুযোগ বাস্তবে কতটা কাজে আসবে? কৃষি অফিস, উপজেলা প্রশাসন, ব্যাংক, কৃষক সংগঠন, চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনকে এ কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। তবে সবার দায়িত্ব মানে অনেক সময় কারও দায়িত্ব নয়। তাই সরকারকে একজন প্রধান সমন্বয়কারী নির্ধারণ করে দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। 

কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে মৌসুমে আলু, আম বা সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম পড়ে যায়। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ না থাকায় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। পরে কয়েকটি হাত ঘুরে সেই পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। সব মধ্যস্বত্বভোগীকে সমস্যার কারণ বলা ঠিক নয়। পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে তাঁদের প্রয়োজন রয়েছে। তবে বাজারতথ্যের ঘাটতি ও কৃষকের দুর্বল দর-কষাকষির কারণে অপ্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী স্তর তৈরি হলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক বাজার ও সরাসরি ক্রয়কেন্দ্র কার্যকর হতে পারে। 

উৎপাদন এলাকার কাছেই পণ্য সংগ্রহ, বাছাই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে কৃষক বড় পাইকার ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারবেন। প্রতিদিনের বাজারদর প্রকাশ, সঠিক ওজন এবং দ্রুত অর্থ পরিশোধও নিশ্চিত করা জরুরি। কাঁচা পণ্য নয়, মূল্য সংযোজন: উত্তরবঙ্গের বড় সম্ভাবনা রয়েছে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনে। কাঁচা আমের পরিবর্তে আমের পাল্প ও জুস, আলু থেকে চিপস ও স্টার্চ, ভুট্টা থেকে পশুখাদ্য, দুধ থেকে দুগ্ধজাত পণ্য এবং সবজি থেকে সংরক্ষণযোগ্য খাদ্য তৈরি করা সম্ভব। ধান থেকেও উন্নত প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের বাজার তৈরি করা যায়। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, স্থানীয় শিল্প গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তবে একটি কারখানা বা হিমাগার তৈরি করলেই হবে না। উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে
সমন্বিত করতে হবে। 

আরও পড়ুন

টাকা আছে, উদ্যোক্তা কোথায়? অর্থায়নের সুযোগ থাকলেই উদ্যোক্তা তৈরি হয় না। অনেক তরঙ্গ ও কৃষক নতুন ব্যবসায় যেতে আগ্রহী হলেও প্রকল্প তৈরি, বাজার বিশ্লেষণ, বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের অভাবে উদ্যোগ শুরু করতে পারেন না। তাই সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা চিহ্নিত করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রকল্প তৈরিতে সহায়তা করা এবং বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার দায়িত্ব নির্দিষ্ট করতে হবে।ব্যাংকের দায়িত্ব অর্থায়ন করা; উদ্যোক্তা তৈরি করা তাদের মূল দায়িত্ব নয়। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ দায়িত্ব নিতে হবে। একই সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি-শিল্প পরিকল্পনা প্রয়োজন।

রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম, বগুড়া-জয়পুরহাটে আলু ও ভুট্টা, নওগাঁয় ধান-ডাল-তেলবীজ, পাবনায় দুগ্ধ এবং রংপুর-দিনাজপুরে আলু, ভুট্টা ও সবজিভিত্তিক শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। ঋণ বিতরণ নয়, ফলাফলই আসল এই কর্মসূচির সাফল্য কত টাকা ঋণ বিতরণ হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে কত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলো, কতটি কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল, কত কর্মসংস্থান হলো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের কতটা বেশি মূল্য পেলেন। অর্থায়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা উৎপাদনকে বাজারের সঙ্গে, বাজারকে প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে এবং প্রক্রিয়াজাতকরণকে শিল্প ও রপ্তা-ি নর সঙ্গে যুক্ত করবে। অন্যথায় এটি আরেকটি ঋণ বিতরণ কর্মসূচি হয়েই থাকবে।

উত্তরবঙ্গের কৃষিকে তাই শুধু 'উৎপাদনের অঞ্চল'হিসেবে নয়, 'মূল্য সংযোজন, শিল্প ও রপ্তানির অঞ্চল' হিসেবে দেখতে হবে। শেষ পর্যন্ত সাফল্যের হিসাব একটাই কৃষকের আয় কতটা বাড়ল এবং তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য কতটা নিশ্চিত হলো।

লেখক: সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক ।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উত্তরবঙ্গের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন: বদলাবে কি এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি

অধিক লাভের আশায় কৃষি জমিতে দুই শতাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ

পাবনার ঈশ্বরদীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে কুপিয়ে জখম

কেনিয়ায় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত: ইকুয়েডরের গোয়েন্দাপ্রধানসহ নিহত ৭

রাজধানীতে ডিএমপির অভিযান: ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার  ৫০৬

মেসির গোল-অ্যাসিস্টেও জয় পেল না মায়ামি