ভিডিও বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১২ আগস্ট, ২০২৬ ০২:২২ পিএম

উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্রে নতুন প্রশাসনিক মানচিত্র

উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্রে নতুন প্রশাসনিক মানচিত্র

মুহাম্মদ মাছুদুর রহমান : বগুড়া বিভাগ কেন সময়ের অপরিহার্য দাবি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কখনোই একটি স্থির বা অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থা ছিল না। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতার পর থেকে দেশের ক্রমবর্ধনশীল জনসংখ্যা, আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার সার্বিক পরিধি সম্প্রসারণের প্রয়োজনে বারবার প্রশাসনিক সীমানা পুনর্গঠন করতে হয়েছে। 

১৯৯৩ সালে বরিশাল, ১৯৯৫ সালে সিলেট এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালে ময়মনসিংহের পৃথক বিভাগের মর্যাদা পাওয়া সেই ধারাবাহিকতারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, মাত্র চারটি করে জেলা নিয়ে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ তাদের যাত্রা শুরু করেছিল। এই দুই নতুন বিভাগের বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং গণমানুষের দাপ্তরিক সেবাপ্রাপ্তি সহজতর করার জন্য বিশালাকার আয়তন বা ডজন ডজন জেলার প্রয়োজন পড়ে না। বরং প্রয়োজন হয় ভৌগোলিক যৌক্তিকতা, সঠিক অর্থনৈতিক সংহতি, সুনির্দিষ্ট জনসংখ্যাগত ভারসাম্য এবং সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রশাসনিক মানদন্ডের আলোকে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট এবং নওগাঁ এই পাঁচটি জেলা সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠন এখন আর কেবল কোনো আঞ্চলিক আবেগের বিষয় নয়; এটি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত, বাস্তবভিত্তিক ও অপরিহার্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ। 

বর্তমানে প্রস্তাবিত এই পাঁচটি জেলার প্রশাসনিক বিন্যাস লক্ষ্য করলে একটি স্পষ্ট ভৌগোলিক অসঙ্গতি চোখে পড়ে। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলা বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের অংশ; অন্যদিকে একই ভূখন্ডের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার গাইবান্ধা জেলা অবস্থান করছে রংপুর বিভাগের অধীনে। ভৌগোলিকভাবে পরস্পর সংলগ্ন এবং নিবিড় আর্থসামাজিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এই কৃত্রিম প্রশাসনিক বিভাজনের ফলে ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনিক জটিলতা ও সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, রাজশাহী বিভাগের সদর দপ্তর থেকে সিরাজগঞ্জ বা গাইবান্ধার দূরবর্তী উপজেলাগুলোর দূরত্ব দেড়শ কিলোমিটারেরও বেশি। অথচ গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, চিকিৎসাসেবা, বাণিজ্য ও সামাজিক যোগাযোগ রাজশাহী বা রংপুরের তুলনায় বগুড়ার সঙ্গেই অনেক বেশি গভীর, স্বতঃস্ফূর্ত ও যাতায়াতবান্ধব। জনসংখ্যার পরিসংখ্যানগত হিসাব বগুড়া বিভাগ গঠনের প্রশাসনিক দাবিকে গাণিতিকভাবে বহুগুণ শক্তিশালী করে তোলে। 

২০২২ সালের সর্বশেষ জাতীয় জনশুমারি অনুযায়ী বগুড়া জেলার জনসংখ্যা ৩৭ লাখ ৩৪ হাজার, সিরাজগঞ্জের ৩৩ লাখ ৫৮ হাজার, নওগাঁর ২৭ লাখ ৮৫ হাজার, গাইবান্ধার ২৫ লাখ ৬২ হাজার এবং জয়পুরহাটের ৯ লাখ ৫৬ হাজার জন। এই পাঁচ জেলা মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৩৪ লাখ, যা দেশের বর্তমান আটটি বিভাগের মধ্যে অন্তত ছয়টি বিভাগের নিজস্ব জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। প্রসঙ্গত, সিলেটের জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ১০ লাখ এবং বরিশালের ছিল মাত্র ৯১ লাখ। এমনকি ময়মনসিংহ বিভাগের ১ কোটি ২২ লাখ জনসংখ্যার চেয়েও প্রস্তাবিত বগুড়া বিভাগ লোকসংখ্যার বিচারে অগ্রগামী। সুতরাং আয়তন বা জনসংখ্যা কোনো দিক থেকেই এটি একটি ক্ষুদ্র বা অকার্যকর প্রশাসনিক একক হবে না। 

দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে সুশাসন নিশ্চিতকরণে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সাফল্য অনস্বীকার্য। ভারতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে উত্তর প্রদেশ ভেঙে উত্তরাখন্ড, বিহার ভেঙে ঝাড়খন্ড, মধ্যপ্রদেশ ভেঙে ছত্তিশগড় এবং পরবর্তীতে অন্ধ্রপ্রদেশ ভেঙে তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠন করা হয়েছিল। নেপালও তাদের নতুন সংবিধানে রাজ্যগুলোকে প্রশাসনিক প্রদেশে বিভক্ত করে জনসেবাকে ত্বরান্বিত করেছে। এই সমস্ত আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো বৃহৎ ও সুদূরপ্রসারী প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে আঞ্চলিক হাবে রূপান্তর করা গেলে সুশাসন নিশ্চিত করা বহুলাংশে সহজ হয়ে যায়। অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে বগুড়াকে অঘোষিতভাবেই উত্তরবঙ্গের চালিকাশক্তি বলা যায়। কৃষিযন্ত্রপাতি প্রস্তুত, স্পেয়ার পার্টস, হালকা প্রকৌশল শিল্প, টেক্সটাইল, ডেইরি এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্যের বিপুল বাজারের কারণে বগুড়া দীর্ঘদিন ধরে পুরো উত্তরাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করছে। এর সঙ্গে সিরাজগঞ্জের অর্থনৈতিক অঞ্চল, জয়পুরহাটের খনিজ ও পোল্ট্রি শিল্প, নওগাঁর খাদ্য ভান্ডার এবং গাইবান্ধার কৃষিজ উৎপাদনের সমন্বয় ঘটালে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত আরও শক্তিশালী হবে। 

আরও পড়ুন

সুসংবাদ হলো, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এই অঞ্চলের প্রশাসনিক গুরুত্ব রূপ পেতে শুরু করেছে। নিকার-এর ১২১তম সভায় সরকার সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের পুনর্গঠনে এই পাঁচ জেলা নিয়ে বগুড়ায় সড়ক জোন এবং নওগাঁয় সড়ক সার্কেল গঠনের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি বগুড়াকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা এবং ্#৩৯; বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ্#৩৯; (ইউঅ) আইনের অনুমোদন প্রমাণ করে যে, কৌশলগত প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে এই অঞ্চলটি সরকারের নজরে ইতিবাচক অগ্রযাত্রায় রয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ হিসেবে এটি আত্মপ্রকাশ করলে সাধারণ নাগরিকগণ সরাসরি বহুমুখী সুফল ভোগ করবেন। প্রথমত, বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি কার্যালয়, সমন্বিত স্বাস্থ্য প্রশাসন ও শিক্ষা বোর্ডের কাজের জন্য দূর-দূরান্তের মানুষকে আর ১০০-১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাজশাহী বা রংপুরে দৌড়াতে হবে না; ফলে সময় ও অর্থের প্রভূত সাশ্রয় হবে। দ্বিতীয়ত, নতুন আঞ্চলিক কার্যালয় ও হাইকোর্টের প্রস্তাবিত সার্কিট বেঞ্চ স্থাপনের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তৃতীয়ত, উচ্চমানের বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে উঠবে। চতুর্থত, বিভাগীয় মর্যাদার ফলে নতুন নতুন বিনিয়োগকারীরা শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত হবেন, যা সামগ্রিক জিডিপিতে ভূমিকা রাখবে। 

সর্বোপরি, বিশ্ব ঐতিহ্য মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরকে কেন্দ্র করে পর্যটন খাতের সমন্বিত বিকাশ ঘটবে। এই পদক্ষেপ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রশাসনিক চাপ কমাতেও সাহায্য করবে। দীর্ঘদিনের গণদাবি ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের পরিপ্রেক্ষিতে বগুড়াকে পূর্ণাঙ্গ বিভাগ ঘোষণা করা এখন সময়ের প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত।

লেখক: পিএইচডি গবেষক ও ক্লাব সেক্রেটারি, বগুড়া প্রফেশনালস ক্লাব । ০১৬১৬-৩২৭৭৫৫

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্রে নতুন প্রশাসনিক মানচিত্র

 ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো : রিজভী

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে দৈনিক করতোয়ার ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

 মেসি-সুয়ারেজ-নইমারকে আবারও দেখা যাবে এক দলের জার্সিতে!

 রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন প্রস্তাব জেলেনস্কির

 রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন প্রস্তাব জেলেনস্কির