ভিডিও বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৫০ পিএম

বগুড়ার ভারী শিল্পের নিরব বিদায় : কারখানার কঙ্কালে বহুতল ভবন

নাসিমা সুলতানা ছুটু : এক সময়ের শিল্প শহর হিসেবে পরিচিত বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী কল-কারখানা ভেঙে গড়ে তোলা হচ্ছে আবাসন ব্যবসা । এসব শিল্প কারখানার মধ্যে অন্যতম ভান্ডারী ও জামিল গ্রুপ। এছাড়াও রয়েছে জাহেদ মেটাল। 
একসময় শ্রমিকের উচ্চকন্ঠ আর কটনমিল থেকে ভেসে আসা সাইরেনের শব্দে ঘুম ভাঙতো সত্তোর্ধ্ব রওশনআরা বেগমের। শুধু কী তাই, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও নির্ধারণ করতেন ওই সাইরেনের আওয়াজে। বগুড়া শহরের শিববাটি এলাকার বাসিন্দা রওশনআরা বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘বগুড়া ভান্ডারী কটনমিল’-এর কথা এভাবেই স্মরণ করলেন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘সে সময় দেয়ালে ঘড়ি টানানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। সাইরেনের শব্দ শুনেই আমরা সময় বুঝে সংসারের কাজ, রান্না-খাওয়া, ঘুম সবই করতাম। কল-কারখানার সেই ভোঁ ভোঁ শব্দটাই যেনো ছিল আমাদের জীবনের ছন্দ।’ রওশন আরা বেগমের চেনা সেই শিববাটি এলাকার কটনমিলের জায়গায় এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বহুতল আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স। চাকার গর্জন আর সাইরেনের শব্দ হারিয়ে গেছে ইট-কংক্রিটের দেয়ালের আড়ালে।

এক সময় বগুড়া শহরের যে জমিগুলোতে শ্রমিকের কোলাহল আর যন্ত্রের চাকার শব্দে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন সচল থাকত, আজ সেখানে স্থান করে নিয়েছে ইট-পাথরের বহুতল ভবনের আবাসন। বগুড়াকে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পনগরী হিসেবে পরিচয় করে দেওয়া ঐতিহ্যবাহী কটন স্পিনিং মিলস, হাবিব ম্যাচ ফ্যাক্টরি, জান-ই-সাবা সাবান, মেঘনা সিগারেট, গ্ল্যাস ফ্যাক্টরি, জাহেদ মেটালের কোদাল-কড়াই কিংবা তাজমা সিরামিক আজ কেবলই ইতিহাস। আশির দশকের শেষে ও নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে কারখানাগুলোর চাকা চিরতরে থমকে গিয়েছিল। আর আজ, কয়েক দশক পর, সেই কলকারখানার জমিতেই গড়ে উঠেছে রমরমা আবাসন প্রকল্প ও হাউজিং এস্টেট।

গত শতাব্দীর চল্লিশ থেকে ষাটের দশকে বগুড়ায় গড়ে উঠেছিল একে একে দেশের শীর্ষস্থানীয় কিছু ভারী ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে অবিভক্ত ভারত থেকে ‘জামিল গ্রুপের’ প্রতিষ্ঠাতা হাজী আব্দুল গফুর তার পরিবারসহ বগুড়ায় এসে শহরের পুরান বগুড়া সংলগ্ন গোশালা (বর্তমানে জামিল নগর) এলাকায় গড়ে তুলেন বেশ কিছু ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো ‘মেঘনা, রমনা, সিলভার স্মোক’ নামে জামিল ব্র্যান্ডের সিগারেট, ‘জান-ই সাবা’ নামে প্রসাধনী ও কাপড় কাচার সাবান, এডিবল অয়েল নামে ভোজ্যতেল এবং প্রিন্টিং ও মুদ্রণ কারখানা। ১৯৪৬ সালে শিল্পপতি হাবিবুর রহমান ভান্ডারীর হাত ধরে শহরের শিববাটি এলাকায় ৯ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত হাবিব ম্যাচ ফ্যাক্টরি ছিল উত্তরবঙ্গের দিয়াশলাইয়ের একচেটিয়া জোগানদার। এরপর ১৯৫৪ সালে একই গ্রুপ একই এলাকায় ২২ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠা করে বগুড়া কটন স্পিনিং মিলস। এছাড়াও ভান্ডারী গ্রুপের গ্লাস ফ্যাক্টরি, নর্থ বেঙ্গল ট্যানারি, আয়রন ফ্যাক্টরি, ভোজ্যতেল, বিড়ি, জর্দাসহ প্রায় ১৩টি ভারী, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। 

১৯৫৫ সালে শহরের কামারগাড়ী এলাকায় জাহেদ আলী মিয়া (জাহেদুর রহমান) ‘জাহেদ মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে বগুড়ায় ফাউন্ড্রি ও হালকা প্রকৌশল শিল্প প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। ওই কারখানায় কৃষিকাজে ব্যবহৃত কোদাল, নলকূপ, কড়াইসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি হতো। এর ঠিক পরপরই, ১৯৫৮ সালে কলোনী এলাকায় প্রয়াত মুহাম্মদ আবদুল জব্বারের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, যা ছিল সমগ্র বাংলাদেশের সর্বপ্রথম সিরামিক কারখানা। 
বগুড়ায় গড়ে ওঠা এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে কারখানার চাকা ও হাজার হাজার শ্রমিকের পায়ের শব্দে তখন মুখরিত থাকত শহরের শিববাটি, গোশালা, কামাড়গাড়ী ও কলোনী এলাকা। 

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর  সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দেশের বড় বড় ও পুরাতন ৭৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক-বীমাসহ ২৫৪টি প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হয়। এরমধ্যে বগুড়ার ভান্ডারী গ্রুপের কটন স্পিনিং মিল, গ্লাস ফ্যাক্টরি এবং জামিল গ্রুপের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান এবং জাহেদ মেটালের কারখানাগুলো জাতীয়করণ করা হয় । আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লুটপাট, দুর্নীতি, কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ব্যবস্থাপনার ত্রুটিতে বছরের পর বছর লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া এই মিলগুলোকে আশির দশকে বেসরকারি খাতে মূল মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও অর্থনৈতিক কারণে তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বাজার প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের সংকট এবং ক্রমাগত লোকসানের মুখে একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় বগুড়ার বিখ্যাত ভান্ডারি ও জামিল গ্রুপের এই বৃহৎ শিল্প ইউনিটগুলো। অন্যদিকে বর্তমান দশকের শুরুতে বন্ধ হয়ে যায় জাহেদ মেটাল লিমিটেডও। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই ভারী শিল্পগুলোকে আর পুনরুজ্জীবিত করা হয়নি। উল্টো মিলগুলোর শত শত বিঘা জমি নামমাত্র মূল্যে বা নিজেদের উদ্যোগে রূপান্তর করা হয়েছে আবাসিক প্লট ও ফ্ল্যাটে। অপরদিকে বগুড়ায় গ্যাস সংযোগ আসার পর তাজমা সিরামিক ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও বর্তমান প্রতিযোগিতার বাজারে তেমন সুবিধা করতে না পেরে রুগ্ন অবস্থায় টিকে রয়েছে।

এই শিল্প বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে খেটে খাওয়া শ্রমিকদের ওপর, যা তাদের পরিবারগুলোকে ঠেলে দেয় চরম অনিশ্চয়তা ও দুঃসহ দরিদ্রতার দিকে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় জামিল গ্রুপের ‘জান-ই সাবা’ কোম্পানীর প্রয়াত কর্মী সুত্রাপুর এলাকার নজরুল ইসলামের স্ত্রী মমতা বেগমের কথায়। মমতা জানান, ‘১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরে যখন কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়, তারপর থেকেই ছোট-ছোট সন্তানসহ আমাদের যৌথ পরিবারের সংসারটি যেনো হঠাৎ গুহায় পড়ে যায়। ওই কোম্পানী থেকে কোনো সার্ভিস বেনিফিটের টাকাও পাওয়া যায়নি। সে সময়টা আমাদের খুব দুঃসহ ছিলো। সংসারের প্রধান আয়কারীর যদি আয় বন্ধ হয়ে যায় তখন কী বিপর্যয়টাই না নেমে আসে, তারপর ঘুরে দাঁড়ানো বেশ অসম্ভব হয়ে পড়ে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নজরুল ইসলামের মত এসব কল-কারখানায় কাজ করা অনেক শ্রমিকের পরিবার বকেয়া বেতন-ভাতা না পেয়ে তিন বেলা ঠিকমতো খাওয়ার অধিকার হারায়, টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যায় সন্তানদের পড়াশোনা। অনেক দক্ষ শ্রমিক শেষ বয়সে রিকশা চালিয়ে বা দিনমজুরি করে কোনোমতে বেঁচে থাকার লড়াই করেছেন, আবার অনেকে চিকিৎসার অভাব ও অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছেন।

আরও পড়ুন

বগুড়া ভান্ডারী গ্রুপের উত্তরাধিকারী বাপ্পী ভান্ডারী জানান, কটন মিল, ম্যাচ ও গ্লাস ফ্যাক্টরি, জর্দা, ট্যানারিসহ তাদের মোট ১৩টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিলো। এখন আর কোনটিই চালু নেই। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষ সময়ে দক্ষ পরিচালনার অভাব, বিজাতীয়করণের পর শ্রমিকদের বিশাল অংকের পাওনা পরিশোধ, কারখানাগুলোকে আধুনিকায়নের জন্য ব্যাংক ঋণ নিতে ব্যাংকের অসহযোগিতাসহ বিভিন্ন কারণে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে শিল্প কারখানার জায়গাগুলো প্লট আকারে বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া ভান্ডারীগ্রুপের সব উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদগুলো ভাগ হয়ে যাওয়ায় যে যার মত বিক্রি হয়েছে কিছু রয়েছে। বাপ্পী ভান্ডারী সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, এখনো আমার কটনমিলের সাইরেনের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেন, ৮ ঘন্টা পরপর সাইরেন বাজানো হতো। কটনমিলের আশে-পাশেই শ্রমিকরা থাকতেন, তারা ওই শব্দে কারখানায় আসা যাওয়ার সময়সহ দিনের অন্যান্য কাজ-কর্মের সময় নির্ধারণ করতেন।

শ্রমিকদের বেকারত্বের এই কান্নার ওপর দাঁড়িয়েই গত দুই দশকে বগুড়া শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকা কারখানাগুলোর শত শত একর জমি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যায়। শিববাটি, জামিলনগর, কামারগাড়ী এলাকার সেই বিশাল বাণিজ্যিক চত্বরগুলোতে কারখানার চিমনি ও শেড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক বহুতল আবাসিক ফ্ল্যাট, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট এবং শপিং কমপ্লেক্স। জমির উচ্চ মূল্যের কারণে মালিক ও আবাসন ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও, এই রূপান্তর বগুড়ার শিল্পায়নের ইতিহাসকে চিরতরে মুছে দিয়েছে। শিববাটি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আলী হায়দার জানান, যেখানে কটন মিলের বড় বড় শেড ছিল, সেখানে এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট। জামিলনগরের পাশেই মালগ্রাম এলাকায় বসবাসকারী সত্তরোর্ধ্ব ফুলমিয়া বলেন, ‘এক সময় এই রাস্তা দিয়ে শত শত শ্রমিক যাতায়াত করতেন। মিলগুলো বন্ধ হওয়ার পর এলাকাটা ভুতুড়ে হয়ে গিয়েছিল। এখন বড় বড় বিল্ডিং হয়েছে, মানুষ ফ্ল্যাট কিনে থাকছে। কিন্তু আগের সেই জৌলুস আর নেই, বগুড়া আর আগের মতো বড় কারখানা তৈরি করতে পারল না।’

বগুড়া আবাসন শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি সাইরুল ইসলাম জানান, বগুড়ায় ভারীশিল্পের জায়গাগুলোতে যে আবাসনগুলো গড়ে উঠেছে, মূলত ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরাই আবাসন ব্যবসায়ীদের কাছে হয়তো বিক্রি নয়তো ফ্ল্যাট করার জন্য চুক্তি করেছেন। অনেক শিল্প মালিকের মোটা অংকের ব্যাংক ঋণ ছিলো। দিনদিন সেই ঋণের পরিমাণ বাড়ছিলো, তাই তারা এই ঋণ থেকে মুক্তি পেতেই আবাসনখাতে তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানের জায়গাগুলো ছেড়ে দিয়েছেন। তবে শিল্প প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে আবাসন গড়ে তোলা অবশ্যই দুঃখজনক। কারণ শিল্প প্রতিষ্ঠান থাকলে সেখানে যেমন অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয় তেমনি দেশের অর্থনীতির চাকাও শক্তিশালী হয়, যেটা আবাসন শিল্পে সম্ভব নয়। 

বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আল মেহেদী হাসান জানান, একটি উন্নয়নশীল শহরের জন্য আবাসন খাত জরুরি হলেও, সচল বা সম্ভাবনা থাকা শিল্পাঞ্চল ধ্বংস করে আবাসন তৈরি করা আত্মঘাতী। তবে পুরানো যে শিল্প এলাকায় আবাসন হয়েছে নতুন করে এই রকম হওয়া আর সম্ভব নয়। বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের জন্য মাস্টারপ্ল্যান করা হবে। ওই মাস্টারপ্ল্যানে শিল্পজোন এলাকায় শুধু শ্রমিকদের জন্য ‘শিল্পাঞ্চল আবাসন’ গড়ে তোলা হবে। সেখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আবাসন ব্যবসায়ীরা আবাসন গড়তে পারবেন না।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক 
০১৭৪৯-৬৪৪৯১৭

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ার ভারী শিল্পের নিরব বিদায় : কারখানার কঙ্কালে বহুতল ভবন

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে করতোয়ার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত

সিলেটে বাসা থেকে স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার

আজ ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে ২০ রেল কোচ

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন:  ২০ আগস্ট ডাকা হয়েছে সংসদের বৈঠক

পথচলার অর্ধশত বছর