কাজ না করেই বিল তোলার পাঁয়তারা, সওজের কোটি টাকার বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে হরিলুট!
স্টাফ রিপোর্টার : ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগিয়ে সারাদেশে সবুজায়নের এক মহতী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। কিন্তু সরকারের এই প্রশংসনীয় উদ্যোগকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা লোপাটের পাঁয়তারা চলছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের পশ্চিমাঞ্চল, রাজশাহীর নির্বাহী বৃক্ষপালনবিদ কার্যালয়ে।
অভিযোগ উঠেছে, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন মহাসড়কে গাছ না লাগিয়েই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিলের চেক কেটে রাখা হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে বনায়ন না হলেও সরকারি তহবিল ঠিকই খালি হতে চলেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সওজের পশ্চিমাঞ্চল (অপারেশন বিভাগ) গত ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে (সূত্র নম্বর : ৩৫.০১.০০০০.১৫১-(৫-২)-১২৭/১ (১)) বিভিন্ন প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করে, যা খোলা হয় গত ১৮ মে।
জুন মাসে অর্থবছর শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে এই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় কাজের মান ও বাস্তবায়ন নিয়ে শুরুতেই প্রশ্ন ওঠে। প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রতিটি চারা গাছ কেনা, রোপণ ও আনুষঙ্গিক কাজের জন্য প্যাকেজভেদে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি মহাসড়কের মোট ৮০ কিলোমিটার এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, যার বাজেট ২ কোটি টাকারও বেশি। এর চেয়েও বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে গাছগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটার রোপণ এলাকার বিপরীতে ২ বছরের জন্য অভিজ্ঞ মালি নিয়োগের কথা। মাসে ১০ হাজার টাকা করে ২ বছরে প্রায় ২০৮৮ জন মালির বেতন বাবদ খরচ ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকারও বেশি।
দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, সওজের আওতাধীন যেসব এলাকায় চারা রোপণ ও মালি নিয়োগের কথা সেগুলো হচ্ছে বগুড়া-নওগাঁ-মহাদেবপুর-পত্নীতলা-ধামইরহাট-জয়পুরহাট (আর-৫৪৫) ৫৯-৬৮ কিলোমিটার পর্যন্ত পর্যন্ত ৯ কিলোমিটারে ১৩,৫০০ টি গাছ, ২১৬ জন মালি, ওই একই সড়ক (আর-৫৪৫) ৭২-৮৩ কিলোমিটার পর্যন্ত মোট ১০ কিলোমিটারে ১৫,০০০ টি গাছ ২৪০ জন মালি, ওই একই সড়ক (আর-৫৪৫) ৮৭-১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারে ১৭,৫০০ টি ২৮৮ জন মালি, মহাদেবপুর-সরাইগাছি-পোরশা-নিতপুর (জেড-৫৪৫৬) ৮-১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত মোট ৭ কিলোমিটারে মোট ১০,৫০০ টি ১৬৮ জন মালি, বগুড়া (কাথম)-কালিগঞ্জ-রানীনগর (জেড-৫২০৭) ২২-২৪, ৩১-৩২ ও ৩৮ কিলোমিটার পর্যন্ত মোট ১৪ কিলোমিটারে ২১,০০০ টি ৩৩৬ জন মালি, বগুড়া (জাহাঙ্গীরবাদ)-নাটোর (এন-৫০২) ৫১-৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত মোট ৯ কিলোমিটারে ১৩,৫০০ টি গাছ ২১৬ জন মালি, ওই একই সড়ক (এন-৫০২) ৩২-৪৭ কিলোমিটার পর্যন্ত মোট ১৩ কিলোমিটারে ১৯,৫০০টি ৩১২ জন মালি, গোবিন্দগঞ্জ-ঘোড়াঘাট-বিরামপুর-ফুলবাড়ী-দিনাজপুর (আর-৫৮৫) ৭৪-৮২ কিলোমিটার পর্যন্ত মোট ৮ কিলোমিটারে ১২,৮০০ টি গাছ ১৯২ জন মালি, সৈয়দপুর-পার্বতীপুর (জেড-৫০১১) ৪-৯ কিলোমিটার পর্যন্ত মোট৫ কিলোমিটারে ৯,০০০টি গাছ ১২০ জন মালি নিয়োগের কথা।
আরও পড়ুনএছাড়াও খুলনা বিভাগের আওতাধীন বেশ কিছু মহাসড়কেও এই প্রকল্পের আওতায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই-একটি সড়ক বাদে অধিকাংশ সড়কেই এখনো গাছ লাগানোর কাজ শেষ হয়নি, কোথাও কোথাও শুরুই করা যায়নি। অথচ অর্থবছরের শেষ ভাগে এসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিলের চেক কেটে রাখা হয়েছে।
দরপত্রের শর্তানুযায়ী, ৬০০×৬০০×৪৫০ মিলিমিটার পরিমাপের গর্ত খুঁড়ে বেলে-দোহাঁশ মাটি ও গোবর সারের মিশ্রণ দিয়ে, ১৮০০ মিলিমিটার দীর্ঘ বাঁশের খুঁটি ও পাটের রশি দিয়ে চারা শক্ত করে বাঁধার কথা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই নিয়ম মানার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী বৃক্ষপালনবিদ কার্যালয়ের এস্টিমেটর মির্জা হোসেন জানান, নির্দিষ্ট কোনো গাছের নাম উল্লেখ না করে ঠিকাদারদের ফলদ, বনজ, ওষুধি ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী গাছ লাগাতে বলা হয়েছে এবং গাছ প্রতি ১৫০-১৬০ টাকা ধরা হয়েছে। সওজের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) গোবিন্দ গাইন সংক্ষেপে বলেন, গাছ লাগানো চলছে, এখনো শেষ হয়নি। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
অন্যদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়নে গড়িমসি ও কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল প্রস্তুতের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাঈদ মো. মীর মুকুট বলেন, সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় গাছ লাগাতে একটু দেরি হয়েছে, এখন লাগানো হচ্ছে। আর অর্থবছরের মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় নিয়ম রক্ষার্থে বিলের চেক কেটে রাখা হয়েছে মাত্র, তা ঠিকাদারকে এখনো দেওয়া হয়নি। কাজ পুরোপুরি শেষ হলে তবেই বিল দেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন



_medium_1783352632.jpg)





