ভিডিও সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৬ জুলাই, ২০২৬ ০৩:৫৫ পিএম

পিয়নের চাকরিতে স্নাতকোত্তর, ফুটপাতে হকার: শ্রমবাজারের নীরব সংকেত

পিয়নের চাকরিতে স্নাতকোত্তর, ফুটপাতে হকার: শ্রমবাজারের নীরব সংকেত, ছবি: সংগৃহীত।

একটি দেশের শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা সব সময় শুধু বেকারত্বের পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। কখনও তা ফুটে ওঠে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে, কখনও আবার শহরের ফুটপাতে জীবিকার সন্ধানে নেমে আসা মানুষের ভিড়ে। সম্প্রতি পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক (পিয়ন) পদে এসএসসি পাস যোগ্যতা চাওয়া হলেও নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় অংশই স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমবিএ কিংবা প্রকৌশল ডিগ্রিধারী। একই সময়ে দেশের বড় শহরগুলোতে হকার, অটোরিকশা এবং নানা ধরনের ক্ষুদ্র অনানুষ্ঠানিক ব্যবসার বিস্তারও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। দুটি ঘটনা ভিন্ন মনে হলেও, গভীরে তাকালে দেখা যায়, এগুলো একই অর্থনৈতিক বাস্তবতার দুটি প্রকাশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের বেকারদের বড় অংশই তরুণ। আবার প্রায় ৮২ লাখ ৬০ হাজার তরুণ এমন অবস্থায় রয়েছেন, যারা না শিক্ষা, না কর্মসংস্থান, না কোনো প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত (NEET)। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশেরও বেশি কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে। অর্থাৎ এমন কর্মক্ষেত্রে, যেখানে চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, পেনশন, বীমা কিংবা শ্রম আইনের পূর্ণ সুবিধা সাধারণত থাকে না। হকার, রিকশা ও অটোরিকশাচালক, ক্ষুদ্র দোকানি, নির্মাণশ্রমিক এবং অসংখ্য স্বনিয়োজিত মানুষ এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রকৃত সাফল্য কি কেবল জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে, নাকি সেই প্রবৃদ্ধিকে মানুষের শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থানে রূপান্তর করার মধ্যেও নিহিত? যদি অর্থনীতি পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসুযোগ সৃষ্টি করতে পারত, তাহলে কি একজন স্নাতকোত্তর তরুণ এসএসসি-যোগ্যতার একটি পদের জন্য প্রতিযোগিতা করতেন? কিংবা এত মানুষ কি জীবিকার তাগিদে অনানুষ্ঠানিক খাতকে শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হতেন?

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বেকারত্ব নয়; বরং শিক্ষিত মানবসম্পদের অপূর্ণ ব্যবহার। অর্থনীতির ভাষায় একে Underemployment বা Misallocation of Talent  বলা হয়। অর্থাৎ মানুষ কাজ করছেন, কিন্তু তাঁদের শিক্ষা, দক্ষতা ও সম্ভাবনার সঙ্গে সেই কাজের সামঞ্জস্য নেই। এর ফলে ব্যক্তি তাঁর সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা অর্জন করতে পারেন না, আর রাষ্ট্রও শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের দীর্ঘদিন বেকার থাকার আর্থিক সামর্থ্য নেই। তাই চাকরি না পেলে তাঁরা বিকল্প জীবিকার পথ খুঁজে নেন। কেউ হকার হন, কেউ অটোরিকশা চালান, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন। এটি ব্যক্তির ব্যর্থতার নয়; বরং অর্থনীতির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। এ কারণেই হকার বৃদ্ধি বা অটোরিকশার সংখ্যা বাড়াকে শুধু আইন-শৃঙ্খলা কিংবা নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে মূল কারণটি আড়ালেই থেকে যায়। অবশ্যই পথচারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং নগর শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কিন্তু কেবল উচ্ছেদ অভিযান সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। কারণ মানুষকে স্থানচ্যুত করা সম্ভব, কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দূর করা যায় না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করেছে। ভিয়েতনাম গত দুই দশকে রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বয়ের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ আনুষ্ঠানিক ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিকস ও উৎপাদনশিল্পের সম্প্রসারণ কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুল জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন হলেও শিক্ষা, দক্ষতা, শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগকে সমন্বিত না করলে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। ইতিবাচক দিক হলো, সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কর্মসংস্থানকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বাজেটে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ প্রতিষ্ঠা, যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো উদ্যোগের ঘোষণা রয়েছে। এগুলো নিঃসন্দেহে সঠিক দিকের নীতিগত পদক্ষেপ। তবে বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার ওপর নয়, কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। কারণ শ্রমবাজারের বর্তমান সংকট কেবল চাকরির সংখ্যা বাড়ানোর নয়; শিক্ষিত তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 

বাংলাদেশ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করা, যেখানে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের গুণগত মানও সমান গুরুত্ব পাবে। জেলা পর্যায়ে শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, বাজারমুখী দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন।

আরও পড়ুন

পাবনার পিয়ন নিয়োগ কিংবা শহরের ফুটপাতজুড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসার বিস্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো বাংলাদেশের শ্রমবাজারের নীরব সংকেত। এই সংকেত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশের মানুষের কাজ করার আগ্রহের অভাব নেই; ঘাটতি রয়েছে তাঁদের শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসুযোগের। তাই হকার উচ্ছেদ, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিম্নপদের চাকরিতে উচ্চশিক্ষিতদের ভিড়কে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে মূল বাস্তবতা অধরাই থেকে যাবে। সাম্প্রতিক বাজেটে কর্মসংস্থানকে যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, তার প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ হবে তখনই, যখন এসএসসি-যোগ্যতার একটি চাকরিতে স্নাতকোত্তরদের ভিড় আর খবর হবে না এবং জীবিকার তাগিদে ফুটপাত মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠবে না। একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত মানদন্ড কেবল তার জিডিপি নয়; তার শিক্ষিত তরুণেরা কতটা তাঁদের যোগ্যতার মর্যাদা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাচ্ছেন, সেটিও। যে দিন একটি ডিগ্রি কেবল একটি সনদ নয়, বরং একটি মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবনের দ্বার খুলে দেবে, সেদিনই বাংলাদেশের উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে।


ফারুক আহমেদ

 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পিয়নের চাকরিতে স্নাতকোত্তর, ফুটপাতে হকার: শ্রমবাজারের নীরব সংকেত

সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালালো চীন

‘বিশ্বকাপ জিতলেও আমি আরও বেশি ক্রিশ্চিয়ানো হয়ে যাব না’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কোনো শান্তি নেই : গালিবাফ

আশুগঞ্জে কাভার্ড ভ্যানের চাপায় প্রকৌশলীর স্ত্রী নিহত

পেনাল্টির সময় নরওয়ের গোলরক্ষককে কী বলেন নেইমার