বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পে এসেছে গতি, ৮ বছরের জটে ব্যয় বাড়ছে ৭ হাজার কোটি টাকা
স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়া ও সিরাজগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত সরাসরি রেলপথ প্রকল্পটি অবশেষে নতুন গতি পেয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অর্থায়নের জটিলতা কাটিয়ে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) সহায়তায় আলোর মুখ দেখছে এই মেগা প্রকল্প।
বর্তমানে বগুড়া থেকে ট্রেনে ঢাকা যেতে হলে সান্তাহার, নাটোর ও পাবনার ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও ট্রেন পরিচালন ব্যয় দুই-ই অনেক বেশি লাগে। নতুন ৭৬ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলপথটি নির্মিত হলে ঢাকা ও বগুড়ার মধ্যে রেলের দূরত্ব এক লাফে ১১৪ কিলোমিটার কমে যাবে।
ফলে উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের মূল্যবান সময় বাঁচবে প্রায় ৩ ঘণ্টা। এর মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সমগ্র উত্তরাঞ্চলের একটি দ্রুত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এই প্রকল্পের ফাইল ৮ বছর ধরে ঝুলে থাকায় নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং কাজের পরিধি বাড়ায় প্রকল্প ব্যয় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
২০১৮ সালে যখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এটি প্রথম অনুমোদন পায়, তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। বর্তমানে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ, আট বছরের ব্যবধানে খরচ বেড়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর অনুমোদনের সময় প্রকল্পটিতে ভারতীয় ঋণে (এলওসি) অর্থায়নের কথা ছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের মার্চ মাসে এই প্রকল্পে ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল করে। ফলে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
পরবর্তীসময়ে বর্তমান সরকারের বিশেষ উদ্যোগে অর্থায়নে এগিয়ে আসে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ‘এআইআইবি’। অর্থায়নের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। আগের নির্ধারিত সময়সীমা (২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের জুন) পরিবর্তন করে সংশোধিত প্রস্তাবে তা ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ বছর বাড়ানো হয়েছে। গত ১৪ জুন সংশোধিত ডিপিপি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে প্রকল্প দপ্তর। মন্ত্রণালয় থেকে এটি দ্রুতই পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে এক মাসের মধ্যে তা একনেক সভায় উঠবে বলে রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
আরও পড়ুনমূল ডিপিপিতে ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে চূড়ান্ত নকশা ও এলাইনমেন্ট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৯০১ দশমিক ৭৭ একরে। জমি কমলেও পুনর্বাসন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ খাতেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ, শুধু এই এক খাতেই ব্যয় বেড়েছে ৩২৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। বর্তমানে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ সীমান্তে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদান চলছে এবং বগুড়া অংশে ইতোমধ্যে ২৫ শতাংশ মানুষকে টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সর্বশেষ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী রেল ফ্লাইওভার ও বিভিন্ন সম্প্রসারণমূলক কাজ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের মোট ব্যয় ও পরিধি বেড়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৮৬ দশমিক ৫১ কিলোমিটার মূল লাইন এবং ৩৭ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ করা হবে। রেলপথটি বগুড়া সদর, কাহালু, শাজাহানপুর, শেরপুর, রায়গঞ্জ, কামারখন্দ এবং সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ওপর দিয়ে যাবে।
পুরো রুটে মোট ১১টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, সোনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রানীরহাটে ৮টি নতুন স্টেশন তৈরি করা হবে। অন্যদিকে বগুড়া, কাহালু ও সদানন্দপুর স্টেশন তিনটিকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুননির্মান করা হবে। রানীরহাট এলাকায় একটি বিশেষ ওয়াই আকৃতির রেলপথ তৈরি করা হবে, যার একটি শাখা যাবে বগুড়ার দিকে এবং অন্যটি যুক্ত হবে কাহালুর সঙ্গে।
তাছাড়া করতোয়া নদীর ওপর ২৪৬ মিটার এবং ইছামতি নদীর ওপর ২০৫ মিটার দীর্ঘ দুটি বড় সেতুসহ মোট ১২১টি ছোট-বড় সেতু নির্মাণ করা হবে। সড়ক ও রেলের ক্রসিং এড়াতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ওপর একটি রেল ওভারপাস এবং ঢাকা-নাটোর মহাসড়কের ওপর একটি রোড ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা এই প্রকল্পটিকে ২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন







