আধুনিক জাহেলিয়াত ও শিশু সুরক্ষা: সমাজ কোন পথে
স্রষ্টার সৃষ্টির অন্যতম সুন্দর উপহার হলো প্রতিটি পরিবারের কন্যাসন্তানরা। যাদের হাসিমুখ আর কলকাকলিতে আলোকিত হয়ে থাকে প্রতিটি সংসার। বাবার অতি আদরের রাজকন্যা আর মায়ের লক্ষ্মীটি হয়ে যারা বড় হতে থাকে, আজ আমাদের এই তথাকথিত আধুনিক সমাজে তারাই সবচেয়ে বেশি অসুরক্ষিত। যে নিষ্পাপ শিশুরা সংসারকে আলোয় ভরিয়ে রাখার কথা, কলুষিত চরিত্রের কিছু নরপশুর থাবায় প্রতিনিয়ত সেই আলো নিভে যাচ্ছে। খবরের পাতা খুললেই প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও অবুঝ শিশুদের ওপর নির্মম নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার খবর চোখে পড়ে। এই ভয়াবহতা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি তবে আধুনিকতার আড়ালে একবিংশ শতাব্দীর ‘জাহেলিয়াত’ বা অন্ধকার যুগে বাস করছি? আজকের সমাজে মেয়ে শিশুরা নিজের সমাজ, প্রতিবেশী, এমনকি অনেক সময় নিজের আপনজনদের কাছেও নিরাপদ নেই। যদি চারপাশের চেনা মানুষগুলোই শকুনের রূপ নেয়,তবে এই অবুঝ ফুলগুলোর নিরাপদ আশ্রয়স্থল আসলে কোথায়?
সমাজে প্রায়ই ধর্ষণের পেছনে পোশাকের শালীনতা বা চলাফেরাকে দায়ী করার একটি অপচেষ্টা দেখা যায়। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার অনেকেই বলে থাকেন, শালীন পোশাকের অভাবই এই অপরাধের মূল কারণ। কিন্তু এই যুক্তি যে কতটা ভিত্তিহীন ও হাস্যকর,তা প্রমাণ হয় যখন চার-পাঁচ বছরের অবুঝ শিশু বা নাবালিকারা এই পৈশাচিকতার শিকার হয়। এই নিষ্পাপ ফুলগুলোর কী দোষ ছিল? দোষ পোশাকের নয়; দোষ অপরাধীর বিকৃত মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার।
এই সামাজিক মহামারীর প্রধান কারণ হলো ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। এত জঘন্য অপরাধ করার পরও,একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন বিষিয়ে দেওয়ার পরও অপরাধীরা যখন আইনের ফাঁকফোকর গলে কিংবা সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ায়, তখন অন্য অপরাধীদের মনেও ভয়ডর কেটে যায়। বিচারহীনতা বা ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়া অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। উপযুক্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ভুক্তভোগী পরিবার যখন বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘোরে, তখন তা পুরো বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। একজন পেশাদার আইনজীবী যখন সামান্য অর্থের বিনিময়ে বা স্বার্থের টানে এমন জঘন্য অপরাধীর পক্ষে আদালতে দাঁড়ান, তখন বিবেকবান মানুষের ধিক্কার দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। এই নৈতিক অবক্ষয়ের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং পর্ণোগ্রাফির সহজলভ্যতা। প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা এগিয়ে চললেও, এর একটি অন্ধকার জগৎ আমাদের তরুণ ও যুবসমাজকে গ্রাস করছে। রাতের অন্ধকারে পর্নোগ্রাফির নীল দুনিয়ায় ডুবে থাকা যুবকদের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। তারা নারীকে মানুষ হিসেবে না দেখে কেবলই একটি ‘ভোগ্য পণ্য’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। এই বিকৃত চিন্তাভাবনাই সমাজকে আজ এক অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে।
আমরা আর কোনো মায়ের বুক খালি দেখতে চাই না। প্রতিটি কন্যা শিশু যেন ভয়হীন, স্বাধীন এক পরিবেশে বিকশিত হতে পারে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের। এর জন্য প্রথমত দরকার আইনের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড হলেও এর কার্যকারিতা দৃশ্যমান হতে হবে। ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই ধরনের মামলার বিচার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করতে হবে। একই সাথে, প্রতিটি পরিবারে ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা ও নারীকে সম্মান করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। রাতের আধারে পর্ণোগ্রাফির যে সংক্রামক ব্যাধি সমাজকে ধ্বংস করছে, তা থেকে নতুন প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর সাইবার সেন্সরশিপ এবং পারিবারিক নজরদারি বাড়ানো জরুরি। আসুন, সামাজিকভাবে এই নরপশুদের বয়কট করি। অপরাধীর কোনো দল বা পরিচয় নেই,তার একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী। আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধই পারে এই ‘আধুনিক জাহেলিয়াত’ থেকে আমাদের কন্যাসন্তানদের রক্ষা করতে।
আরও পড়ুনলেখক :
তানিয়া আক্তার
গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








