হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য খেজুর গাছ
নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধি : এক সময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে, মাঠের আইল ও পতিত জমিতে দেখা মিলত সারি সারি দেশীয় খেজুর গাছের। এসব গাছে ধরত ছোট ছোট মিষ্টি স্বাদের খেজুর, যা ছিল গ্রামীণ মানুষের কাছে একটি পরিচিত ও জনপ্রিয় ফল। কিন্তু সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কমতে শুরু করেছে খেজুর গাছের সংখ্যা।
ফলে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ দেশীয় ফলটির। বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এক সময় যেসব এলাকায় প্রচুর খেজুর গাছ ছিল, বর্তমানে সেসব এলাকায় হাতে গোনা কিছু খেজুর গাছ টিকে আছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে খেজুর গাছের সংখ্যা। বসতবাড়ি নির্মাণ, রাস্তা সম্প্রসারণ, কৃষি জমির ব্যবহার বৃদ্ধি, অপরিকল্পিতভাবে গাছ কেটে ফেলা এবং নতুন করে খেজুর গাছ রোপণে অনীহার কারণে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এ দেশীয় ফল।
উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের শশিনগর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, ছোটবেলায় গ্রামের চারপাশে অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল। মৌসুমে গাছে প্রচুর খেজুর ধরত। স্কুল থেকে ফেরার পথে বন্ধুরা মিলে খেজুর পেড়ে খেতাম। এখন সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। অনেক এলাকায় খেজুর গাছ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বুড়ইল ইউনিয়নের রিধইল গ্রামের সংবাদকর্মী ও দলিল লেখক একাব্বর হোসেন পুটু বলেন, আগে বাড়ির আশপাশে অনেক খেজুর গাছ ছিল। বিভিন্ন সময় বাড়িঘর নির্মাণ ও অন্যান্য প্রয়োজনে গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। নতুন করে খেজুর গাছ লাগানোর প্রতিও মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। কারণ এই গাছ বড় হতে অনেক সময় লাগে।
আরও পড়ুনস্থানীয় ফল ব্যবসায়ী সেলিম হোসেন জানান, এক সময় স্থানীয় বাজারে প্রচুর দেশীয় খেজুর পাওয়া যেত। বর্তমানে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারেও এ ফলের সরবরাহ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই দেশীয় খেজুরের সঙ্গে তেমন পরিচিত নয়। নন্দীগ্রাম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলী আজম বলেন, খেজুর গাছ শুধু একটি ফলজ গাছ নয়, এটি গ্রামীণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল হিসেবে এ গাছ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে খেজুর গাছ। নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশীয় ফল সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করা গেলে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এ ফলকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। অন্যথায় এক সময় গ্রামবাংলার পরিচিত এ ফলটি শুধুই স্মৃতির পাতায় স্থান করে নেবে।
নন্দীগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম কামাল বলেন, দেশীয় ফলের গাছ সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন হতে হবে। রাস্তার ধারে, খাস জমি ও বসতবাড়ির আশপাশে বেশি করে খেজুর গাছ রোপণ করা হলে হারিয়ে যাওয়া এ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্য তুলে ধরতে খেজুরসহ দেশীয় ফলের গাছ সংরক্ষণের বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে নন্দীগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গাজীউল হক বলেন, দেশীয় ফল সংরক্ষণে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে দেশীয় ফলের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দেশীয় ফলের গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের দেশীয় ফলের গাছ রোপণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি করা গেলে খেজুর গাছ সংরক্ষণ সম্ভব হবে।
মন্তব্য করুন







