মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে কম বগুড়ায়, যমুনা বেষ্টিত চরাঞ্চলের চিত্র ভিন্ন
স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলার মধ্যে মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে কম বগুড়া জেলায়। এবং সবেচয়ে বেশি নওগাঁ ও পাবনা জেলায়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রকাশিত বার্ষিক শিক্ষা জরিপে উঠে এসেছে এই তথ্য।
তবে বগুড়া সদরসহ সমভূমির উপজেলাগুলোতে ঝরে পড়ার হার কম হলেও চরবেষ্টিত তিনটি উপজেলায় বাল্যবিবাহ ও সচেতনতার অভাবে ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি।
ব্যানবেইসের সর্বশেষ ২০২৪ সালের জরিপের তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে ছিটকে পড়ার বা ঝরে পড়ার হার যেখানে উদ্বেগজনক ৩২.৮৫ শতাংশ, সেখানে এই স্রোতের বিপরীতে আশার আলো দেখাচ্ছে শিক্ষানগরী খ্যাত বগুড়া। প্রাপ্ত সরকারি তথ্যানুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৪.৮০ শতাংশ ঝরে পড়ার হার নিয়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে নওগাঁ জেলা। এর পরেই রয়েছে নদী ভাঙন কবলিত পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলা।
ওই দুটি জেলায় এই হার যথাক্রমে ৩৩.৫০ শতাংশ এবং ৩২.৮০ শতাংশ। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩১.০০ শতাংশ, নাটোরে ৩০.২০ শতাংশ, রাজশাহী জেলায় ২৯.৫০ শতাংশ এবং জয়পুরহাটে ২৮. ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। তবে অন্যান্য জেলার তুলনায় বগুড়া মাত্র ২৫.৫০ শতাংশ।
জেলা হিসেবে এই গড় পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক হলেও খোদ বগুড়ার ভেতরে উপজেলাভিত্তিক বৈষম্য বেশ চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও ব্যানবেইসের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বগুড়া সদর ও শাজাহানপুর উপজেলায় ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে কম। সদরে মাত্র ৭.৫০ শতাংশ এবং শাজাহানপুরে ৯.২০ শতাংশ। শেরপুর, দুপচাঁচিয়া ও কাহালু উপজেলায় এই হার ১০.৫০ শতাংশ থেকে ১২.৮০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
গাবতলী, শিবগঞ্জ ও আদমদীঘি উপজেলায় এই হার ১৫.০০ শতাংশ থেকে ১৮.২০ শতাংশ এবং নন্দীগ্রাম ও ধুনটের সমতল অংশে তা ১৯ শতাংশ থেকে ২২.৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। যমুনার চরাঞ্চল বেষ্টিত সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের চরাঞ্চলগুলোতে এই হার ২৫ শতাংশ থেকে ২৯.৮০ শতাংশ পর্যন্ত ।
আরও পড়ুনবগুড়া জেলায় কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্য এবং শিক্ষার প্রতি সামাজিক ও পারিবারিক বিনিয়োগ বেশি। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতনতা স্কুলগুলোতে মেয়েদের ঝরে পড়া রোধে বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে বিভাগের অন্যান্য জেলার উচ্চহারে ঝরে পড়ার বিপরীতে বগুড়াকে ‘এডুকেশন হাব’ হিসেবে ধরা হয়। বগুড়ার মূল শহর ও উপজেলাগুলোর চিত্র যতটা উজ্জ্বল, যমুনার অববাহিকার সারিয়াকান্দি, ধুনট ও সোনাতলা উপজেলার চরাঞ্চলে ঠিক ততটাই বিপরীত চিত্র।
জানা গেছে, মূল ভূখণ্ডের নিম্ন ঝরে পড়ার হার যখন পুরো জেলার পরিসংখ্যানকে ভালো দেখাচ্ছে, তখন চরের স্কুলগুলোতে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী উধাও হয়ে যাচ্ছে। চরাঞ্চলের ঝরে পড়ার মূল দুটি কারণ বাল্যবিয়ে এবং জীবিকার তাগিদে অল্প বয়সে শ্রমের বাজারে প্রবেশ।
চরের অনেক পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে। নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ছেলেদের রাজমিস্ত্রি, পোশাক শ্রমিক বা রিকশাচালক হিসেবে শহরগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, নিরাপত্তাহীনতা ও অসচ্ছলতার কারণে মাধ্যমিকের গন্ডি না পেরোতেই মেয়েদের বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করেন অভিভাবকরা।
বগুড়া জেলা শিক্ষা অফিসার রমজান আলী আকন্দ বলেন, ‘শিক্ষার মানোন্নয়নে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধসহ ঝরে পড়া কমাতে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এই লক্ষ্যে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থী সবাইকে সচেতন হতে হবে।
জাতীয় বাজেটে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া রোধে উপবৃত্তি ও অন্যান্য প্রকল্পে ব্যাপক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দের সুষ্ঠু ব্যবহার যদি বগুড়ার চরাঞ্চলীয় স্কুলগুলোতে নিশ্চিত করা যায়, তবে আগামীতে বগুড়া জেলায় ঝরে পড়ার হার আরও কমিয়ে এনে সারা দেশের জন্য অনন্য এক মডেল হতে পারে।
মন্তব্য করুন








