ডাকঘর সঞ্চয় সংস্কৃতি: ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের চাপে হারানো আস্থা
ডাকঘর সঞ্চয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একসময় ছিল নির্ভরযোগ্য ও আশ্বাসের একটা বিশাল জায়গা । এটি স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে সঞ্চয়ের মানসিকতা তৈরি করে থাকে। কোন কাগজপত্রের ঝামেলা ছাড়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বল্প আয়ের মানুষেরা সহজেই তাদের উপার্জিত অর্থের একটি অংশ জমা করতে পারতো যা ভবিষ্যতে কোন বাড়িঘর নির্মাণ, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যতে বিপদের দিনে ব্যবহার করার জন্য সঞ্চয় করতো। গ্রামের কৃষক থেকে শহরের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে ডাকঘরের সঞ্চয় ছিল নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সময়ের আবর্তনে এই সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দ্রুত প্রসার, প্রযুক্তি নির্ভর আর্থিক সেবা ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা ডাকঘর সঞ্চয় যেন আজ আস্থার সঙ্কটে পড়েছে।
একসময় ডাকঘর শুধু চিঠি আদান প্রদানের কেন্দ্র নয়, এটি ছিল আর্থিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এটি ছিল অত্যন্ত সহজলভ্য ও বিশ্বাসযোগ্য একটি ব্যবস্থা । ডাকঘরের বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্প যেমন ঃ সঞ্চয়ী হিসাব, মেয়াদী আমানত ও ডাক জীবন বীমা ইত্যাদি মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়ায় মানুষ মনে করতো এখানে টাকা রাখা সবচেয়ে নিরাপদ। অনেক পরিবারে সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য ডাকঘরে সঞ্চয় রাখা ছিল একটি স্বাভাবিক অভ্যাস। এই অভ্যাস মানুষের মাঝে সঞ্চয়ের মানসিকতা তৈরি করত এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ঘটেছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং অনলাইন আর্থিক সেবার মাধ্যমে মানুষের লেনদেন পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ সহজেই ঘরে বসে আর্থিক লেনদেন করতে পারছে। বিভিন্ন বিল পরিশোধ করতে পারে মোবাইলের মাধ্যমে যার দরুন কমে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতের কদর। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের এই সহজলভ্যতা এবং দ্রুততার কারণে নতুন প্রজন্ম দ্রুত এই ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের এই সহজলভ্যতা এবং দ্রুততার কারণে নতুন প্রজন্ম দ্রুত এই ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী ডাকঘর সঞ্চয় ব্যবস্থার প্রতি তাদের আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। ডাকঘর জৌলুশ হারানোর প্রধান কারণ সমূহ হলো: সুদের হার হ্রাস। গত কয়েক বছরে সরকারের পক্ষ থেকে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বেশ কয়েক দফায় কমানো হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৪ থেকে সরকার কিছু সঞ্চয়পত্র ও পোস্ট অফিস সঞ্চয় স্কিমের সুদের হার কমিয়েছে এবং তা প্রায় ০.৪৭% থেকে ০.৫৭% পর্যন্ত কমানো হয়েছে। ডাকঘর সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহ হারানোর আরো একটি কারণ হলো বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ। আগে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সীমা অনেক বেশি ছিল যা এখন কমিয়ে আনা হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা বিকল্প মাধ্যম খুঁজছে।
এছাড়াও রয়েছে জটিল নগদায়ন ও অটোমেশন। বর্তমানে সঞ্চয়পত্র কিনতে হলে এবং মুনাফা উত্তোলন করতে হলে অনলাইন ডাটাবেস ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে সংযোগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনেক বয়স্ক বা গ্রামীণ বিনিয়োগকারীর জন্য এই ডিজিটাল প্রক্রিয়াটি কিছুটা জটিল মনে হয়। আরও একটি কারণ হল উৎসে কর বৃদ্ধি। অর্জিত মুনাফার ওপর উচ্চহারে উৎসে কর (১০% পর্যন্ত) কর্তন করার ফলে প্রকৃত আয়ের পরিমাণ কমে গেছে। আবার আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা ও দায়ী। নির্দিষ্ট সীমার উপরে বিনিয়োগ করতে হলে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা অনেক ক্ষুদ্র আমানতকারীকে নিরুৎসাহিত করছে। এখন আধুনিকায়নের চাপে হারিয়ে যাওয়া ডাকঘরের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে আমাদের কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। যেমন ব্যাংকিং খাতের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারকে কিছুটা আকর্ষণীয় পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন, যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল মেলাতে পারে। এছাড়াও ক্ষুদ্র আমানতদারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান বিশেষ করে নারী ও সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আলাদা ‘ প্রিমিয়াম রেট ‘ চালু করা সম্ভব। ডাকঘরগুলো ব্যাংকিং সেবা বা ‘পোস্টাল ব্যাংকিং’ এর মত আধুনিক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করলে গ্রাহক হয়রানি কমবে। সেবার মান উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করলে এই খাতে মানুষের জনপ্রিয়তা আবার ফিরে আসতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যোগ করা যেতে পারে যা এই সংস্কৃতি ফিরিয়ে নিয়ে আসবে জনপ্রিয়তা। তা হলো ডিজিটাল আপ চালু করা। অবশেষে প্রচারণা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ডাকঘর সঞ্চয়ের নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিয়ে পুনরায় প্রচারণা চালনা প্রয়োজন। ব্যাংক দেওলিয়া হওয়ার ঝুকি থাকলেও সরকারি সঞ্চয়পত্র যে শতভাগ নিরাপদ, এই বার্তাটি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে হবে। ডাকঘর সঞ্চয় কেবল একটি বিনিয়োগ মাধ্যম নয়,এটি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে এর হারানো জৌলুশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সঞ্চয়ের সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঐতিহ্যবাহী এই ব্যবস্থাকে নতুন যুগের প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। তাহলেই হয়তো আবারও মানুষ ছোট ছোট সঞ্চয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়ে তুলবে ডাকঘরের সেই পরিচিত কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে।
আরও পড়ুনলেখক :
তানিয়া আক্তার
গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








