ভিডিও রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:১৫ দুপুর

বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি

প্রথমই বিনয়ের সঙ্গে বলে রাখি আমি কোন শিক্ষাবিদ নই এবং বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতও নই, তবে অনেক আগে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলাম সেই কারণে শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা দেখলে তা নজরে পড়ে এবং কষ্ট পাই। গত ৫ এপ্রিল ’২৬ তারিখে দৈনিক করতোয়াসহ দেশের শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকায় একটি খবর ছিল আর তাহলো এবার নকল করলে কেন্দ্রসচিব ও শিক্ষকরা শাস্তি পাবেন। সময়ের সাহসী সন্তান এবারের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ৪ এপ্রিল ’২৬ তারিখে কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে কুমিল্লা অঞ্চলের কেন্দ্রসচিবদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এই হুশিয়ারি দেন। সময়ের সাহসী সন্তান বলার জন্যে অনেকে হয়তো নাক শিটকাইতে পারেন,  কারণ তিনিতো একটি দলের শিক্ষামন্ত্রী, সুতরাং অন্য দলের আদর্শে বিশ্বাসীদের ভাল নাও লাগতে পারে, তবে আপনি মানেন কি না মানেন একথা ঠিক স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশে যতগুলো শিক্ষামন্ত্রী এসেছেন তাদের মধ্যে আ ন ম এহছানুল হক মিলনই ছিলেন একমাত্র শিক্ষামন্ত্রী যিনি হাজারও প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নকলমুক্ত করে ছাত্রদের পড়ার টেবিলে নিয়ে গিয়েছিলেন। শিক্ষকদের শাস্তির কথা বলায় একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। ২০১৬ সালের কথা। বগুড়ার প্রথিতযশা এনজিও লাইট হাউজের কর্ণধার জনাব হারুনুর রশিদ একটি আধুনিক মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার জন্যে বগুড়ার সুধীজনদের মতামত নেওয়ার আবশ্যকতায় তিনি একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিলেন,যেখানে দেশের প্রথিতযশা লেখিকা সেলিনা হোসেন প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। ২০১৭ সনে বগুড়া বারের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার কারণে ইনকামিং সাধারণ সম্পাদক হিসাবে আমিও সেই অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাই। দর্শক সারিতে বসে মতামত শুনছি, এমন সময় হঠাৎ করে আমার নামটা বলা হলো এবং আমার মতামতের জন্য আমাকে বক্তব্য দিতে বলা হলো। প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলাম, পরে নিজকে সামলে নিয়ে কিছু কথা বললাম। সঙ্গে আমার বন্ধুর একটা গল্পও বললাম। আমার অন্তরঙ্গ এক বন্ধু মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইংরেজির শিক্ষক,সে আবার বোর্ডের খাতাও দেখে। বোর্ডের খাতা কিভাবে মূল্যায়ন করতে হয় তখন সে ব্যাপারে শিক্ষকদের নিয়ে একটি প্রস্তুতি সভা করা হয়। বোর্ড কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধির বক্তব্য ইংরেজি পরীক্ষা, ছাত্র এ বি সি ডি যাই লেখুক না কেন তাকে পাশ করে দিতে হবে। আমার বন্ধু আবার স্বাধীনচেতা শিক্ষক, তিনি তখন বলেছিলেন রচনা যদি আসে রিভার আর ছাত্র যদি লেখে দি কাউ তখন আমরা কি করব, মার্ক দিবো ? যে ভদ্র লোক কথা বলছিলেন তিনি উল্টো আমার বন্ধুকে বলেন আপনি কি করবেন, আমার বন্ধু উত্তর দেয়, আমি মার্ক দিব না। উত্তরে বোর্ড কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধির বক্তব্য ছাত্র খাতায় এ বি সি ডি লিখেছে কি না সেটা দেখবেন, ছাত্র যাই লিখুক না কেন শুধু ইংরেজি অক্ষর থাকলে ছাত্রকে পাশ করে দিতে হবে, এটা সরকারি সিদ্ধান্ত। আমার বন্ধু তাঁর সাথে একমত হতে না পারায় আমার বন্ধুর সাথে ঐ ভদ্রলোক এক রকম খারাপ ব্যবহারই করে। এই হলো তখনকার শিক্ষা ব্যবস্থার হাল-চাল। অযথা পাশ দেখিয়ে কি লাভ। ঐ রকম পাশ নিয়ে বাস্তব জীবনে তার খেশারত দিতে হবে। প্রধান অতিথি নিজেও এ ঘটনার নিন্দা জানায়। একটা গল্প আছে, ইন্সপেক্টর স্কুল পরিদর্শনে এসেছেন। সব ক্লাশে গিয়ে ফার্স্ট বয়কে জিজ্ঞেস করছে বলতো সোমনাথ মন্দির কে ভেঙ্গেছে। কোন ছাত্রই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নাই। ইন্সপেক্টরতো রেগে আগুন, প্রতিবছর সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা স্কুলের পিছনে খরচ করা হয় অথচ সোমনাথ মন্দির কে ভেঙ্গেছে এইটা কোন ছাত্র সাহস করে বলতে পারলো না। হেডমাস্টার নিজেও এই প্রশ্নের উত্তর জানতো না। স্কুলের অনুদান আবার বন্ধ হয় কি না হেডমাস্টার এটা মনে করে ইন্সপেক্টর সাহেবকে ভয়ে ভয়ে বললো, স্যার অনেক দুষ্ট ছেলে স্কুলে আছে, কেউ না কেউ এটা ভেঙ্গেছে, দয়া করে এটা মাফ করে দিন। এই হলো শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বয়ং হেডমাস্টার সাহেব নিজেও জানে না, সোমনাথ মন্দির কে ভেঙ্গেছে। এমনিতেই করোনাকালিন সময়ে দীর্ঘদিন ক্লাশ বন্ধ ছিলো, ছাত্র ছাত্রীদের কোন প্রকার পড়াশুনা হয় নাই, তার উপর খাতায় না লেখে পাশ, চিন্তা করা যায়। এমনিতেই জেনারেশন গ্যাপ হয়েছে। করোনার সময়ের মৃত্যু ব্যতিত সকল ক্ষতি এক সময় পুষে যাবে, কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়েছে তা কখনও পুরণ হওয়ার নয়। সতের বছর পর গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে, এখন সময়ের দাবি বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। অযথা পাশ দেখিয়ে কি লাভ। কোন ছাত্র-ছাত্রী যদি পড়াশোনায় মনোযোগী না হয় প্রাইমারির পর পরই তাকে টেকনিক্যাল বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে হবে, এতে ওই ছাত্রের পরিবারও উপকৃত হবে পাশাপাশি দেশও উপকৃত হবে। আজকে মালয়েশিয়ার দিকে তাকান, তারা সবাই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায় না, যার মাথায় পড়া ধরে না তাকে টেকনিক্যাল বিষয়ে পড়ে মালয়েশিয়া আজকে বিশ্বে ধনী দেশের তালিকায় নাম লেখিয়েছে। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকান, নেদারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, জাপান, নিউজিল্যান্ড, লুস্কেমবার্গ, কানাডা তাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কি ? ফিনল্যান্ড জাপানে তো পরীক্ষাই নাই, তারা কিন্তু ধনী দেশের তালিকায় রয়েছে কারণ তারা নকল করে পাশ করে না, তাদের আছে বাস্তবমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদেরকে সেই পথেই হাঁটতে হবে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নকল প্রতিরোধে শিক্ষকদের বিষয়ে যে কথা বলেছেন, তা ওই কথাই মনে করিয়ে দেয়, কুইনাইন জ্বর ছাড়াবে কিন্তু কুইনাইন ছাড়াবে কে, সুতরাং দায়িত্বে অবহেলাকারী শিক্ষকরা হুঁশিয়ার।

লেখক :

এড. মোঃ মোজাম্মেল হক

আরও পড়ুন

পি পি, নারী ও শিশু নির্যাতন 
দমন ট্রাইব্যুনাল-২, বগুড়া।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি

যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের খবরে কয়েক ঘণ্টা চেঁচামেচি করে ট্রাম্প

অধিকাংশ ব্রাজিলিয়ান মনে করেন তাদের দেশ বিশ্বকাপ জিতবে না

হবিগঞ্জে সরকারি জমি নিয়ে সংঘর্ষে কলেজছাত্র নিহত, আহত ৩০

সোমালিল্যান্ডে দূত নিয়োগ ইসরায়েলের, বাংলাদেশসহ ১২ দেশের নিন্দা

শেষ হচ্ছে ‘এটা আমাদেরই গল্প’ ধারাবাহিক