ভিডিও বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:৫৬ দুপুর

জ্বালানির কৃত্রিম সংকট

ক.প্রাক কথন: সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ পেট্রোল পাম্প বন্ধ থাকায় যেগুলো খোলা রয়েছে, সেগুলোর সামনে দেখা গেছে দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে কাক্সিক্ষত তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন, ফলে দৈনন্দিন কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন জেলার ফিলিং স্টেশনে চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে না। পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এরইমধ্যে তেল না পাওয়ার ক্ষোভে এক ডিপো ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে নড়াইল জেলায়। সরকারি তরফে জ্বালানি তেলের মজুত ঠেকাতে বিজিবি মোতায়েনসহ চালানো হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান।

আবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের জেল-জরিমানার প্রতিবাদে রংপুর বিভাগে ডাকা হয়েছে ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি।  এরইমধ্যে একটি জেলায় তেলের পাম্প ঘেরাও করে কৃষকরা বিক্ষোভ করেছেন। এ অবস্থায় সরকারি ডিপোতেও মিলছে তেলের অবৈধ মজুত। সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জাহাজের সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথের পাশাপাশি পাইপলাইনে ডিজেল আমদানিতে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে এখন ৭ হাজার টন ডিজেল আসা শুরু হয়েছে।

খ. তেল নিতেই কাটছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা: রাজধানীতে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাতভর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে চালকদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। অনেকেই সামান্য তেলের আশায় রাতভর পাম্পের সামনে অবস্থান করেন। সকালেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। উল্টো অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মোটর সাইকেল চালক ও রাইড শেয়ারিং কর্মীরা। এক চালক বলেন, ‘রাত দুইটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন সকাল ১০টা বাজে, পাম্প থেকে বলছে তেল শেষ। আজ কামাই-রুজি সব বন্ধ।” লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বেসরকারি চাকরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সকাল থেকে তেল নিতেই সময় চলে যাচ্ছে। দিনের অর্ধেক সময় যদি পাম্পেই কাটে, তাহলে কাজ করবো কখন?’ 

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনেও। রাস্তায় বাসের সংখ্যা অন্যদিনের তুলনায় কম থাকায় যাত্রীদের দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। এ সুযোগে সিএনজি ও রিকশা চালকদের অতিরিক্ত ভাড়া দাবির অভিযোগও উঠেছে। পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন,দ্রুত এই সংকট সমাধান না হলে নিত্যপণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে বাজারে দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ. জ্বালানি তেল বিক্রিতে আসছে ডিজিটাল ব্যবস্থা: দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের বণ্টন নিশ্চিত করতে এবং মজুতদারি ঠেকাতে ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর আওতায় কিউআর কোড বা কার্ডভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই মডেলে ব্যক্তি বা যানবাহনের বিপরীতে জ্বালানি কেনার তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে কে, কোথা থেকে, কী পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করছেন, তা নজরদারি করা যাবে। 

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, ‘পদ্ধতিটি কেমন হবে, তার রূপরেখা তৈরি করতে ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন এর কাজ চলছে। কিছু গ্রাহক বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন থেকে বারবার তেল সংগ্রহ করছেন, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে। এই সমস্যার সমাধানেই মূলত এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

ঘ. ট্যাগ অফিসার নিয়োগ:সার্বিক তদারকি বাড়াতে দেশজুড়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বিপিসির কর্মকর্তারা এই দায়িত্ব পালন করবেন। আর জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেবেন। এসব কর্মকর্তা জ্বালানি ব্যবস্থাপনার তদারকি করবেন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে দৈনিক প্রতিবেদন জমা দেবেন।

ঙ. মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে আবারো বেড়েছে জ্বালানির দাম: হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বৈশ্বিক মানদন্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়েছে। 
২৮ ফেব্রুয়ারির আগে, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭২ ডলার ছিল। গত সপ্তাহে ১৯ মার্চ এটি ব্যারেল প্রতি সর্বোচ্চ ১১৮ ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত এর দাম ছিল ১১২ ডলারের সামান্য নিচে- যা যুদ্ধ পূর্ববর্তী দামের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।দামের এই উল্লম্ফন এমন সময় ঘটল যখন ইরান জানিয়েছে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল হামলার জন্য প্রস্তুত।

চ. সমাপ্তি কথন : রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে যে নিয়ামক কাজ করবে তা হলো জ্বালানি সংকট। জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে অস্থিরতা বিরাজ করবে। এর ফলে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রপ্তানি ঘাটতিতে পড়বে দেশ। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমে যাবে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। ইতিমধ্যেই এ প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু দেশ জ্বালানি সংরক্ষণে মিতব্যয়ী কার্যক্রম গ্রহণ করছে। যেমন শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশ বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হচ্ছে। যদিও হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে না ইরান, তবুও সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সংকটে পড়বে না-এমনটা বলা যাবে না। 

সরকার এখনো  জ্বালানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করেনি। সংকটে আতঙ্কিত হয়ে জ্বলানি কিনে মজুদ করছে দেশের মানুষ।

মাহমুদ হোসেন পিন্টু

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জ্বালানির কৃত্রিম সংকট

চলন্ত বাস থেকে পড়ে চালকের সহকারীর মৃত্যু

এক লাফে এলপিজির দাম বাড়ল ৩৮৭ টাকা !

ইতালির জন্য মন খারাপ স্কালোনির!

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস এবং আমাদের সচেতনতা!

ইরানের হামলায় সরে গেল মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন