ভিডিও মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২

প্রকাশ : ৩১ মার্চ, ২০২৬, ০৪:০০ দুপুর

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল: দায় কার এবং প্রতিকার কোথায়

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি শিকড়ের টানে বাড়ি ফেরার এক বিশাল ধর্মীয় ও সামাজিক  উৎসব। প্রতি বছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলগুলো থেকে গ্রামমুখী যে জনস্রোত তৈরি হয়, তা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাময়িক অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বললে ভুল হবে না। কিন্তু যখন দেশের একজন নাগরিক হিসেবে যখন আমি এই উৎসবের আনন্দযাত্রাকে রক্তক্ষয়ী বিষাদে পরিণত হতে দেখি, তখন এর কারিগরি ও অবকাঠামোগত ত্রুটিগুলো বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কারণ সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকার কারণে এটা অনুধাবন করতে পেরেছি যে বিশাল এ জনগোষ্ঠির চলাচলের জন্য মূলত অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে প্রকৌশলগত ত্রুটি সমাধানে জোর দেওয়া দরকার। 

বিগত দশক হতে প্রায় প্রতি বছরের মতো ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের সময় আমরা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। গত ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যায় রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায় । যেটির বিভৎস ঘটনা  সামাজিক মাধ্যমে ছোট একটি ভিডিওর মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। দুঃখের বিষয় এই যে প্রায় ৮ ঘন্টা পর উদ্ধারকারী দল সেটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এছাড়াও ২১ শে মার্চের কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষ, ২৪ শে মার্চের ট্রাক-অটোরিক্সা সংঘর্ষ ও ২৫ শে মার্চের চট্টগ্রামের ট্রাক-অটোরিক্সা সংঘর্ষ প্রভৃতি ঘটনার মতো আরো অনেক ঘনা অবিরত ঘটে চলেছে এবং মৃত্যুর মিছিলে আকাশ ভারী হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৭ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৮ দিনে ২৬৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২০৪ জন নিহত এবং ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮,৫৪৩ জন নিহত হয়েছিলেন, যা ২০২৫ সালে ৫.৭৯% বৃদ্ধি পেয়ে ৯,১১১ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে সরকারি তথ্যের সাথে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রাক্কলনের বড় ধরনের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। ২০২১ সালে যেখানে পুলিশি রেকর্ডে মৃত্যু সংখ্যা প্রায় ৪,০০০ উল্লেখ করা হয়েছিল, সেখানে WHO-এর মতে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩১,৫৭৮। এক গবেষণা বলছে প্রকৃতপক্ষে গড়ে প্রতিদিন বাংলাদেশে অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন মানুষ রাস্তায় দুর্ঘটনাজনিত কারণে প্রাণ হারায়। হয়তো এ তথ্যের ঘাটতির কারণে সড়ক নিরাপত্তার প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে অসুবিধা হয় এবং যথাযথ প্রকৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণে বড় বাধা পড়ে।

তাহলে এসব দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো কী কী? এ কারণগুলো নিয়ে আমাদের অধিকতর গবেষণা করতে হবে এবং সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। পূর্বের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যানবাহনের অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত ত্রুটি ,গাড়ি চালকদের ওপর অত্যধিক মানসিক চাপ এবং অবকাঠামোগত ত্রুটিই প্রধানত দায়ী। প্রথমত বাংলাদেশে প্রায় ৩৩% বাসের কোনো বৈধ ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই আর্থাৎ চলাচলের অযোগ্য যানবাহন সড়কে অনবরত চলাচল করছে। দ্বিতীয়ত চালকদের ক্লান্তি ও নির্ঘুম ড্রাইভিং অর্থাৎ দক্ষ চালকের অভাব এই মৃত্যুকূপের প্রধান উপকরণ বিশেষ করে ঈদের সময় চালকরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিয়ে একটানা তিন-চার দিন গাড়ি চালায়। যদিও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী চার ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর বিরতির কথা থাকলেও বাংলাদেশে ব্যয় কমানোর জন্য একজন চালক দিয়েই সব ট্রিপ পরিচালনা করা হয়। তৃতীয়ত জ্যামিতিক ত্রুটি ও ব্ল্যাকস্পট অর্থাৎ মহাসড়কগুলোর মাত্র ২% থেকে ৫% স্থানে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে, যেগুলোকে 'ব্ল্যাকস্পট' বলা হয়। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ পথে নকশাগত ত্রুটি এবং অপ্রতুল 'রাইট অফ ওয়ে' (ROW) দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে । চতুর্থত নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব হেতু মাদারীপুরের বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়েতে ঘটে যাওয়া বড় দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে গার্ডরেইল বা নিরাপত্তা বেষ্টনীর অনুপস্থিতিকে দায়ী করা হয়েছে ।

বিশ্বের উন্নত ট্রান্সপোর্ট মডেল বনাম বাংলাদেশের মডেল নিয়ে তুলনা করলে দেখা যায় বিশ্বজুড়ে এখন 'সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ' (Safe System Approach) বা 'ভিশন জিরো' (Vision Zero) মডেল নিয়ে কাজ করা হচ্ছে । যার লক্ষ্য হলো মানুষের ভুল সত্ত্বেও যেন মৃত্যু না ঘটে এমন অবকাঠামো তৈরি করা। অথচ বাংলাদেশে এগুলো নিয়ে যথাযথ গবেষণা তো দূরের কথা অন্যের কাছ থেকে ধারকরা প্রকৌশল মডেল প্রয়োগ করতেও ভুল করছে। যদিও উন্নত দেশগুলোতে পরিবহন বাজেটের একটি বড় অংশ সড়ক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা হয় অথচ আমাদের দেশে ১ শতাংশেরও কম খরচ করা হয়। আবার উন্নত দেশগুলো যখন ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (ITS) ব্যবহার করে গতি নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করছে, আমাদের দেশে তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে।

ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম নিয়ে গবেষকরা বরাবরই বলে আসছে বিশ্বের উচ্চ ঘনত্ব বসতি স্থানগুলোতে নির্দিষ্ট ট্রাকে অর্থাৎ রেলপথে সুনির্দিষ্টভাবে ভালো ফলাফল দিচ্ছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পার্শ্ববর্তী ভারত ও চীন এর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। যদিও অবকাঠামোগত প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় একটু বেশি, তবুও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নে বেশ কার্যকর। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার রেলপথ  নির্মাণ করে সড়কের ওপর চাপ কমাতে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত ৩০ বছর মেয়াদী একটি রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া iRAP (International Road Assessment Programme) টুলের মাধ্যমে সড়কের নিরাপত্তা রেটিং বা স্টার রেটিং করার প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি। সর্বশেষে প্রশ্ন থেকে যায় আমাদের সড়কগুলোকে আর কতকাল রক্তের স্রোতে ভাসাতে হবে? এখন সময় এসেছে কেবল অবকাঠামো উন্নয়নে নয়, বরং প্রতিটি মানুষের নিরাপদ ঘরে ফেরা নিশ্চিত করতে যথাযথ গবেষণা ও প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটানোর।

আরও পড়ুন

লেখক:

প্রকৌশলী লিটন চন্দ্র দাস

সদস্য, ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (IEB). 
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, 
পুন্ড্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল: দায় কার এবং প্রতিকার কোথায়

তেলআবিব লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানো বিএনপি সরকারের এক অনন্য সফলতা :

খাগড়াছড়িতে জঙ্গল থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে সিআইডি

বিশ্বকাপের জন্য দল চূড়ান্ত করে ফেলেছেন আনচেলত্তি!

হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেই ইরান যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প