ডিপফেকের ছায়া: প্রযুক্তির ফাঁদে বিভ্রান্ত বাংলাদেশ
একটা সময় ছিল যখন মিথ্যা বলার জন্য জিহ্বা লাগত। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মিথ্যা তৈরিতে জিহ্বা নয়, প্রযুক্তিই যথেষ্ট। আর এই মিথ্যা বাস্তবতার চেয়েও ভয়ংকর কারণ এটি চোখে দেখা, কানে শোনা এবং বিশ্বাসযোগ্য। ডিপফেক নামক প্রযুক্তি আমাদের সেই অদৃশ্য দুনিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সত্যকে মুছে ফেলে তৈরি হয় এক ভয়াবহ, অথচ নিখুঁতভাবে নির্মিত মিথ্যা। ডিপফেক (Deepfake) শব্দটি এসেছে “ডিপ লার্নিং” এবং “ফেক” এই দুই শব্দের সংমিশ্রণে। এটি এমন এক ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কারো মুখ, কণ্ঠ, এমনকি আচরণও অবিকল নকল করে ভিডিও বা অডিও কন্টেন্ট বানানো সম্ভব হয়। এর পরিণতি হতে পারে মারাত্মক ব্যক্তিগত সম্মানহানি থেকে শুরু করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পড়া পর্যন্ত।
বাংলাদেশে প্রযুক্তি ব্যবহারের হার বেড়েছে হু হু করে। স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়েছে সাধারণ মানুষের হাতে। এই প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে বেড়েছে সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক অপপ্রচার ও গুজব। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করতে, জনপ্রিয় ব্যক্তিকে বিতর্কে জড়াতে, কিংবা সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াতে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে ডিপফেক প্রযুক্তি। গত এক-দু’ বছরে বেশ কিছু ভুয়া ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের বা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মুখে বিভ্রান্তিকর কথা শোনা গেছেÑযা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে সম্পূর্ণ সাজানো। গেলো রমজানে একজন জনপ্রিয় আলেমকে ঘিরে তৈরি হওয়া একটি ভুয়া অডিও ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো বক্তব্য শোনা যায়। পরে জানা যায়, এটি একটি ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে বানানো অডিও। একইভাবে, নির্বাচনী সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কিছু নেতার ভিডিও, যেখানে তারা নাকি রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেনÑতা প্রমাণিত হয়েছে নিছক প্রযুক্তির কারসাজি। এইসব উদাহরণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের মতো প্রেক্ষাপটে ডিপফেক শুধু প্রযুক্তিগত শঙ্কা নয়, এটি একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ গুজবপ্রবণ দেশÑএটা দুঃখজনক হলেও সত্য। পদ্মা সেতু নির্মাণকালে ‘মানব বলি লাগবে’ জাতীয় গুজব থেকে শুরু করে করোনাকালে নানান ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ আমাদের সমাজের অন্ধবিশ্বাস এবং প্রযুক্তি-অপব্যবহারের ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে। এখন, যখন মানুষ ছবি বা ভিডিও না দেখলে কিছু বিশ্বাস করে না, তখন প্রযুক্তি সেই বিশ্বাসকেও ভাঙতে শিখিয়েছে। ডিপফেক ভিডিওকে সত্য বলে মেনে নিয়ে জনতা যখন রাস্তায় নামে, তখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী এসব ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ যেমন হতাশাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও হুমকির মুখে পড়ছে। ডিপফেক প্রযুক্তি নিয়ে আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে ভবিষ্যতের প্রজন্ম এমন এক সমাজে বেড়ে উঠবে, যেখানে সত্য বলে কিছু থাকবে না। তাই সময় এসেছে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় নিচে তুলে ধরা হলো:
১. আইনগত কাঠামো জোরদার: বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থাকলেও তাতে ডিপফেক বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারা অনুপস্থিত। এখন সময় এসেছে একটি আলাদা আইন বা সংশোধিত আইনের মাধ্যমে ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করার। যেমন- ভারত, সিঙ্গাপুর কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যেই প্রযুক্তি অপব্যবহার নিয়ে আইনগত কাঠামো প্রস্তুত করেছে।
২. প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি: সরকারের প্রযুক্তি বিভাগগুলোকে উন্নত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণমূলক টুলস ব্যবহারে সক্ষম করে তুলতে হবে। বিশেষ করে ভিডিও বিশ্লেষণ এবং ডিপফেক শনাক্তকরণ সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত মিডিয়া ও প্রশাসনের মধ্যে।
৩. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিখবেÑকীভাবে একটি ভিডিও বা অডিও যাচাই করতে হয়, সন্দেহজনক কনটেন্ট কীভাবে শনাক্ত করা যায়। একইভাবে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব নিতে হবে।
আরও পড়ুন৪. সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ: ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে দেশের নিয়ম অনুযায়ী কনটেন্ট ফিল্টারিং সিস্টেমে যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে এসব কোম্পানির সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে স্থানীয় আইন অনুযায়ী পরিচালনার ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা: গণমাধ্যমকে তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো ভিডিও বা অডিও প্রচার না করাই উচিত। কারণ একবার প্রচারিত ভুল তথ্য সাধারণ মানুষের মনে চিরস্থায়ী ক্ষতের মতো রয়ে যায়, যা পরে শুধরানো কঠিন। এই সময়ের শিশুরা বড় হচ্ছে এক ভার্চুয়াল বাস্তবতায়, যেখানে তারা যা দেখে, তা-ই বিশ্বাস করে। কিন্তু তারা জানে না, সেই দৃশ্য বা শব্দ কোনো প্রযুক্তি দ্বারা রচিত। এটি তাদের ভবিষ্যতের নৈতিক গঠনকেও বিপন্ন করতে পারে। তাই, শুধু আইন নয়, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সত্য-মিথ্যা বাছাইয়ের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি মানুষকে তার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। ডিপফেক আমাদের প্রযুক্তিগত উন্নতির দৃষ্টান্ত হতে পারত, যদি এটি কেবল বিনোদন বা বিজ্ঞান গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু এখন, এটি এক বিপজ্জনক হাতিয়ারÑযা অপরাধীদের হাতে পড়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে ছিন্নভিন্ন করার ক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা কি প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করব, নাকি তার ফাঁদে পড়ে ধ্বংসের মুখে এগিয়ে যাব? ডিপফেক নিয়ে আজকের সিদ্ধান্ত আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। প্রযুক্তির যুগে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ‘সত্য বনাম প্রযুক্তি’ এবং এ যুদ্ধে জিততে হলে প্রয়োজন সঠিক আইন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সচেতনতা ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই ছায়া থেকে বের হয়ে আবারও সত্য ও বিবেকের আলোয় উদ্ভাসিত হতে চাই এই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।
লেখক :
মোঃ শামীম মিয়া
শিক্ষার্থী, প্রাবন্ধিক
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক






_medium_1774778144.jpg)

